Saturday, October 26, 2019

সিংহবাহিনী রহস্য  পর্ব - ৬ --- সুব্রত মজুমদার


সিংহবাহিনী রহস্য   পর্ব -   ৬  ---    সুব্রত মজুমদার

--চার--
 
 
মহাষ্টমী বলে অনেকেই আজ ভাত খাবে না। অঞ্জলি দেওয়ার পর লুচি ভোগের ব্যবস্থা আছে। ভোগের মেনুতে খাঁটি গাওয়া ঘিয়ের লুচি, বেগুন ভাজা, ছোলারডাল, পনির-পটল আর রাজভোগ। বেশ জমবে আজ।
 
বিক্রম যথারীতি নিজের কাজে মন দিয়েছে। অষ্টমীর অঞ্জলির ফুলের জোগাড়, পদ্মফুলগুলো ধুয়ে বেছে যত্ন করে রাখা, প্রসাদ কাটা ইত্যাদি হরেক রকমের কাজে ব্যস্ত সে। আমি আর তাকে ঘাঁটালাম না। আমি আমার রান্নার ডিপার্টমেন্টে চলে গেলাম। অন্ততঃ শ'পাঁচেক লোক প্রসাদ নেবেন, অত অত লুচি ভাজতে হবে, রান্নার ঠাকুরকে গিয়ে হেল্প করতে হবে।
 
লুচি ভেজে রাশিকৃত হচ্ছে, লুচির গন্ধে গোটা ঘর ম'ম' করছে। ব্যস্ততার শেষ নেই। ঠিক এসময়ই মোবাইল কাঁপিয়ে বিক্রমের ডাক এল। ফোন রিসিভ করেই বেরিয়ে পড়লাম। বিশালবাবুর ঘরের সামনে গিয়ে দেখি একজন বন্দুকধারী কনস্টেবল দরজার সামনে দাঁড়িয়ে। আমাকে দেখেই দরজা ছেড়ে দিল। ভেতরে যেতেই দেখলাম বিক্রম একমনে সারা ঘর সার্চ করে চলেছে। আমাকে দেখেই পকেট হতে একজোড়া রাবার গ্লাভস বের করে আমার হাতে দিয়ে বলল, "পরে নিয়ে কাজে লেগে পড়ো।"
 
ঘরের জিনিসপত্রের মধ্যে বইপত্র, যন্ত্রপাতি আর কেমিক্যালের শিশির সংখ্যাই বেশি। ঘর তো নয় যেন কোনও গবেষণাগার। কিন্তু কি নিয়ে গবেষণা চলছিল বুঝতে পারলাম না। একটা ড্রয়ারের ভেতর হতে হাতে লেখা একটা ডায়েরি পাওয়া গেল। বিক্রম ডায়েরিটা নিজের ব্যাগে ঢুকিয়ে নিল।
বললাম, "কিছু বুঝতে পারলে ?"
 
 
বিক্রম বলল, "মোটামুটি। পারমাণবিক শক্তিকে সুরক্ষিত ভাবে ব্যবহার করার একটা চেষ্টা চলছিল। কিছু অ্যাস্ট্রনমিক্যাল ডায়াগ্রামও পাওয়া গেছে। এখন ডায়েরিটাই শেষ ভরসা। ফরেন্সিক হতে একটা টিম আসছে, ওরা রুমটার রেডিও-অ্যাক্টিভিটি ইমেজিং করবে। আমার অনুরোধই ওরা আসছে। চল, এখানকার কাজ মোটামুটি শেষ। "
 
বিক্রম আর আমি বিশালবাবুর ঘর হতে বেরিয়ে এলাম। ফিরে এসে দেখি উঠানে বিশাল একটা জমায়েত হয়েছে। নিশ্চয়ই কিছু একটা অনর্থ হয়েছে ভেবে গিয়ে দেখি উঠানে চিৎপাত হয়ে শুয়ে রয়েছে এক পাগল, গোটা শরীর তার কাদায় ভর্তি। আমি এগিয়ে গিয়ে পাগলটার মুখের কাছাকাছি মুখটা এনে বললাম, "এই পাগলা, ওঠ ! ওঠ বলছি !"
 
 
পাগলাটা এতক্ষণ চোখ বন্ধ করে শুয়েছিল, হঠাৎই সে বামচোখখানা খুলে বলল, "মগের মুলুক। উলুক ঝুলুক মগের মুলুক।"
আমি বললাম, "এইসা কষে একচড় মারবো না, মগের মুলুক কেন গোটা পৃথিবীটা ঘুরে যাবে। এখন ওঠ, উঠে স্নান করে আসিস... মায়ের ভোগ খাবি।"
 
 
 
পাগলাটা কি বুঝল জানি না তড়াক করে লাফিয়ে উঠে আমাকে জড়িয়ে ধরে কেঁদে উঠলো, "দাদা রে.... এতদিন কোথা ছিলিস রে !" পাগলার গায়ের কাদাতে আমার নতুন পাঞ্জাবী পাজামা বর্ষাকালের গ্রামের কাঁচারাস্তাতে পরিণত হল। দেখলাম আশেপাশের লোকজন যে যার স্টাইলে হাসছে।
বিক্রমের কাছে যেতে বিক্রম বলল, "অনেকদিন পর ভাইয়ের সঙ্গে দেখা তো, ওরকম একটুআধটু হয়। যাও আবার স্নান করে জামাকাপড় পাল্টে নাওগে।"
 
 
অভাগা যেদিকে যায় সাগর শুকায়ে যায়। বিক্রমের দিকে কটমট করে চেয়েই বাথরুমের দিকে যাচ্ছি, এমন সময় আমার পথ আটকে দাঁড়াল দেবলীনা, সাথে শ্রীমান অঘোরনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়। একগাল হেসে দেবলীনা বলল,"তোমার নাকি ভাই এসেছে শুনলাম। পরিচয় করিয়ে দেবে না আমাদের সঙ্গে ?"
 
 
মনে মনে রাগ হলেও কিছু বলতে পারলাম না। পরাশর ঋষির মতো রাগকে বিতরন করে দিলাম সর্বভুতে। কিন্তু অঘোরবাবুর প্রশ্নটা আর নেওয়া গেল না। অঘোরবাবু পেটেন্ট হাসি হেসে বললেন, "ভালোই হল দেবলীনা, আমার বাহুবল বাড়ল। তা তোমার ভাইটি কই সায়ক ?"
সঙ্গে সঙ্গে আমার ব্রহ্মতালুতে যেন একটা বিস্ফোরণ হল, আমি আর থাকতে পারলাম না, জড়িয়ে ধরলাম অঘোরবাবুকে। ওইরকমই সুর তুলে বললাম, "দাদা গো... এখনো মনে হয় উঠানই আছে গো..."
 
 
 
অঘোরবাবুর ধুতি গেঞ্জি কাদায় রাঙা হয়ে উঠলো। ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে আমার দিকে তাকিয়ে রইলেন অঘোরবাবু। দেবলীনা বিপদ বুঝে দে দৌড়।
আবার স্নান করতে হল । পাজামা পাঞ্জাবিটা দু'তিনবার কাচার পরেও গন্ধ গেল না, শেষে নিরুপায় হয়ে শ্যাম্পু দিয়ে কাচলাম। বাপরে ! মনে হল যেন গন্ধমাদন হতে ঘুরে এলাম।
 
 
একটা ব্যাপার আমার মনে বারবার খোটা দিচ্ছে, পাগলা কি সত্যিই পাগলা নাকি অভিনয় করছে ! ওর হাবভাব আমার তেমন ভালো লাগলো না। পাগলামি আলাদা আর বদমাইশি আলাদা। আমি অঘোরবাবুর সঙ্গে যেটা করলাম আমার সঙ্গেও কি সেটাই ঘটেছে !
 
জামাকাপড় পরে রান্নাঘরে গিয়ে হাজির হলাম। মহাষ্টমীর পুজো শেষ হতেই অঞ্জলি শুরু হল। বহুলোক ভক্তিভরে অঞ্জলি দিলেন। এরপর শুরু হল সন্ধিপুজো। ঠাকুরদালানে প্রচণ্ড ভিড়। বিক্রম ভিড় সামলাতে শশব্যস্ত। সন্ধিপুজো শেষ হলে ঠাকুরমশাই বেরিয়ে এলেন। বললেন, "পুজো শেষ, প্রসাদ দেবার ব্যবস্থা কর।"
 
 
অন্তত শ'পাঁচেক লোকের প্রসাদ খাওয়ার ব্যবস্থা হয়েছে। আশেপাশের গ্রামের অনেক লোকের নিমন্ত্রণ আছে। পরিবেশনের সময় সেই পাগলটাকেও দেখলাম। একটা লাইনের একেবারে শেষটাতে বসেছে সে। লুচি দিতে গেলে সে দাঁত বের করে এমন একটা পাগলাটে হাসি দিল যে আমার অন্তরাত্মা শুকিয়ে গেল। ভয় হতে লাগল যে পাগলাটা না আবার কিছু করে বসে। লুচির বালতি নিয়ে তাড়াতাড়ি কেটে পড়লাম।
 
 
খাওয়া দাওয়া শেষ হতেই বিশ্রামের জন্যে ঘরে যাব, এমন সময় দেখলাম পাগলাটা দু'হাত উপরে তুলে গান গাইছে।
উলুক ঝুলুক মগের মুলুক দিয়ে দিলাম তোমায় সুলুক,
আমায় পাগল যতই বলুক পাগল আমি না।
দুই ঘরে তিন ভাইয়েরই বাস, ভেতর ঘরে দু' জন হতাশ,
বাহির ঘরে যেজন ঘোরে তারে চেনে সারা জমানা ।
দুইজনে তিন পুত্র ধরে, পুত্র আবার বিনাশ করে
সুব্রত মরে তাদের ডরে, তারা ভয়ঙ্করের কারখানা।
যেজন সুজন জ্ঞান ধরে তাদের লয়ে বসত করে,
অসাধ্য সাধে তাদের বরে, অসাবধানে ধুম্-তা-না-না।
 
 
গান শুনতে শুনতে বিভোর হয়ে গেলাম। একই পাগলের পাগলামি, নাকি হেঁয়ালি করে বলতে চাইছে কোনও সত্য ! এর উত্তর একমাত্র সময়ই দিতে পারবে। এখন শুধু বিশ্রাম দরকার, সারাদিন যা খাটাখাটি গেছে তাতে শরীর আর চলেছে না।বিছানায় শুয়ে পড়তেই দু'চোখ বেয়ে ঘুম নেমে এল।
 
 
 
(চলবে )