Saturday, October 19, 2019

সিংহবাহিনী রহস্য  পর্ব - ৫ সুব্রত মজুমদার

সিংহবাহিনী রহস্য   পর্ব -  ৫  সুব্রত মজুমদার


এরপর দেহটা কে খুঁটিয়ে পর্যবেক্ষণ করতে লাগলো। পর্যবেক্ষণ শেষে উঠে দাঁড়ালো বিক্রম, পকেট হতে মোবাইল বের করে ফোন লাগালো পুলিশে।
 
 
অঘোরবাবু বললেন, "খুব বিপদ হয়ে গেল মশাই। এখন এই ঔষচে পুজো কিভাবে হবে ! ও ছেলেকে আমি বার বার বলেছিলাম আমেরিকা ফিরে যেতে, - ও গেল না মশাই। কি আছে এই দেশের ভিটেতে ? আমি আর পারছি না..."    অঘোরবাবু কাঁদতে লাগলেন।
 
কিছুক্ষণের মধ্যেই পুলিশ এল। আইনি কাজকর্ম সেরে বডি নিয়ে যাওয়া হল মর্গে। বিক্রম বলল," কি বুঝলেন অফিসার ? "
 
বড়বাবু বললেন," ভেতর হতে ঘর বন্ধ, দেহে আঘাত নেই, বিষক্রিয়ারও কোনও লক্ষণ নেই। আমি এখনই বলতে পারছি না বিক্রমবাবু। তবে পোষ্টমর্টেমের পর অনেকটাই বোঝা যাবে।"
 
বিক্রম বলল, "আমার ধারণা মার্ডার। সুইসাইড করার মতো লোক বিশালবাবু নন, অবিশ্বাস্য মনের জোর ছিল তার।  নাসার মতো সংস্থাতে কাজ করতেন ভদ্রলোক, কিন্তু কেন যে পালিয়ে এলেন সেটাই রহস্য । ফরেন্সিকে যে যৎসামান্য জ্ঞান আমার আছে তাতে এটা 'a case of poison in' - বিষ দেওয়া হয়েছে।"
 
 
বড়বাবু তার বগল থেকে টুপিখানি বের করে পরতে পরতে বললেন," আপনার জন্য কষ্ট হয় স্যার, কতবড় অফিসার ছিলেন আপনি...... আপনার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র হয়েছে স্যার। আমার এক ভাইপো মুম্বই পুলিশে চাকরি করে, সে আমাকে সবকিছুই বলেছে। আপনি যখন চাইবেন সে আপনাকে সাহায্য করবে। এই নেন স্যার, ওর কার্ডটা রেখে দেন।" বড়বাবু পকেট হতে একটা ভিজিটিং কার্ড বের করে বিক্রমকে দিলেন। 
 
 
কার্ডটা পকেটে ঢোকাতে ঢোকাতে বিক্রম বলল," প্রয়োজন পড়লে অবশ্যই যোগাযোগ করব। ফরেন্সিক রিপোর্ট হাতে এলেই আমাকে জানাবেন কিন্তু। "
 
সন্মতিসূচক মাথা নেড়ে বড়বাবু বেরিয়ে গেলেন। অঘোরবাবু হাউমাউ করে কাঁদছেন। দেবলীনা অঘোরবাবুকে শান্ত্বনা দেবার চেষ্টা করতে লাগলো।  অঘোরবাবুর বাড়ির পুজোতে একটু আনন্দ করবো বলে এসেছিলাম, কিন্তু কপাল সর্বত্রই ফলদায়ী। সুখ কপালে সইল না। 
 
 
বডি পোস্টমর্টেমে চলে গেলে  অঘোরবাবু আমাদের ডেকে বললেন, "বিক্রমবাবু, দেবলীনা, সায়ক, - তোমাদের সবার কাছেই আমি ক্ষমাপ্রার্থী। কোথা হতে কি হয়ে গেল বুঝতে পারছি না।"
 
 
বিক্রম অঘোরবাবুর পিঠে হাত রেখে বলল, "ওসব কথা এখন ভাববেন না। বিশালবাবু পিতৃমাতৃহীন, এখন আপনিই উনার বাবা-মা, তাই বুকে পাথর রেখেও বিশালবাবুর উর্ধ্বদৈহিক কাজকর্ম আপনাকেই করতে হবে। আর আপনার অশৌচ বলে মায়ের পুজোয় কোনও ব্যাঘাত হবে না। আমি পুজোয় বসব। "
 
 
"আপনি আমার মান রাখলেন বিক্রমবাবু। করুণাময়ী মায়ের কি যে ইচ্ছা তিনিই জানেন। " ধুতির কোঁচা দিয়ে চোখের জল মুছতে মুছতে বললেন অঘোরবাবু।

বিকালবেলায় পোস্টমর্টেমের রিপোর্ট এল। বড়বাবু বিক্রমকে ফোন করেছিলেন। রিপোর্ট শুনে বিক্রমের আক্কেল গুড়ুম।. " Are you sure officer ? মানে কোথাও ভুল হচ্ছে না তো ?" বিক্রম সন্দেহ প্রকাশ করল।
 
ওপাশ থেকে কি উত্তর এল তা জানা গেল না। বিক্রম কয়েকবার 'হুঁ' আর কয়েকবার 'ও' বলে কথোপকথন শেষ করল। তারপর সোজা অঘোরবাবুর কাছে এস বলল, "আপনার উপর মা সিংহবাহিনীর কৃপা আছে অঘোরবাবু। "
 
অঘোরবাবু বিস্ময়ে হতবাক হয়ে কিছুক্ষণ বিক্রমের দিকে তাকিয়ে রইলেন, তারপর বললেন, "কৃপা ! কিন্তু কৃপার তো কিছুই আমি দেখছি না মশাই। নিয়তি তো সর্বত্রই প্রবল।" 
 
 
অঘোরবাবুর সামনে রাখা একটা চেয়ারে বসে পড়ল বিক্রম, তারপর বলল," পোস্টমর্টেমের রিপোর্টটা পেলাম। মৃত ব্যক্তি ডঃ বিশাল বন্দ্যোপাধ্যায় নন, তিনি অন্যকেউ। মৃতদেহের মুখে অত্যাধুনিক প্রযুক্তির মাস্ক ছিল। কেউ বা কারা ওই অজ্ঞাতপরিচয় ব্যক্তির মৃতদেহকে বিশালবাবুর মাস্ক পরিয়ে ফেলে রেখে যায়। উদ্দেশ্য জানি না, তবে মৃত্যুর কারন 'পোলোনিয়াম'। "
 
 
" পোলোনিয়াম, সে তো সাঙ্ঘাতিক বিষ ! কিছুবছর আগে মধ্যপ্রাচ্যের একজন রাস্ট্রনেতার লিভারে পাওয়া গিয়েছিল 'পোলোনিয়াম-210'।"  দেবলীনা বিস্ময় প্রকাশ করে।

 
কাঠের চেয়ারটাতে একটা দোল খেয়ে নিয়ে ( যদিও এতে পেছন দিকে উল্টে পড়ার রিস্ক আছে, ) বিক্রম দেবলীনাকে  বলল," Yes my darling !  আপনার বিবরণ সত্য। সব পরীক্ষা এখনো সম্পূর্ণ হয়নি, তবে প্রাথমিক রিপোর্ট এটাই। পোলোনিয়াম বিষক্রিয়ার লক্ষন পাওয়া গেছে।"
আমি আর থাকতে পারলাম না, বললাম, "তোমরা দুই বিদগ্ধজনের বুঝলই হবে, আমাদের মতো আমপাবলিকদের জন্যে কিছু তো বলো।"
 
 
বিক্রম আমার দিকে চেয়ে বলল," মাই বয়, বিস্তারিত বলছি, কৃপা করে শ্রবণ করুন। এই পোলোনিয়াম হল একটা তেজস্ক্রিয় মৌল। কোনও মৌলের তেজস্ক্রিয়তার অনেকগুলো কারণ থাকতে পারে। এর মধ্যে একটা হল পরমাণুর নিউক্লিয়াসে অসাম্য। পরমাণু  তার নিউক্লিয়াসকে সাম্যাবস্থায় আনতে আলফা বিটা ও গামা রশ্মি নির্গত করে। এই রশ্মিগুলোই শরীরের কোষকে নষ্ট করে বা মিউটেট করে ক্যান্সারের মতো মারণ রোগ সৃষ্টি করে। আপাতত এটুকু জানলেই হবে। "
 
 
আমি বিজ্ঞের মতো মাথা নাড়ালাম। অঘোরবাবু পরম বিস্ময়ে আমার দিকে চেয়ে রইলেন, বোধহয় এই অল্পক্ষণের মধ্যেই এতবড় গুহ্যত্ত্ব শিখে ফেলায় তিনি আমার উপর মুগ্ধ হয়েছেন। প্রসঙ্গান্তরে যাওয়ার জন্য বললাম,"তাহলে তো আর পুজোয় কোনও বিঘ্ন রইল না। "
 
 
বিক্রম বলল," সেটা ঠিক। কিন্তু বিশালবাবুকে উদ্ধার করতে হবে। আমি জানি না সত্যি সত্যিই উনি ট্র্যাপড কি না। আর সায়ক, তুমি যার সঙ্গে কথা বলেছো তিনি আসল ছিলেন না ধকল সেটাও লাখ টাকার প্রশ্ন। ওর ঘরের একটা তল্লাশি নিতে হবে। আমি বড়বাবুর সঙ্গে কথা বলেছি, উনি চাবি নিয়ে একজন কনস্টেবলকে পাঠিয়ে দেবেন বলেছেন। এখনকার মতো সব কান্নাকাটি বন্ধ করে আজ সপ্তমীর সন্ধ্যা, বিপদ যখন কাটলোই তখন তখন চলো সবাই মিলে আনন্দ করি। "
 
 
আমি বললাম," অবশ্যই, চল ঢোল তবলা পাতি। তবে আজকে কিন্তু তোমাকে একটা গান করতেই হবে। "

আসর বসলো। ঠাকুরমশাই বসলেন হারমোনিয়াম নিয়ে। পৌরহিত্য ছাড়াও তার আরেকটি পেশা আছে, সেটি হল সঙ্গীতশিক্ষক। মার্গসঙ্গীতে তার পাণ্ডিত্য অগাধ। এখানে এসে অনেকবার তার গান শুনেছি। অনেক রাত পর্যন্ত আসর চলল। 

বিছানায় শুয়ে শুয়ে বিশালবাবুর ঘটনাটা ভাবছিলাম, এমন সময় বিক্রম বলল, "কাল তোমার একটা কাজ আছে।" 
 
 
"কি কাজ ?" তন্দ্রা জড়িত অবস্থায় বললাম। 
"সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত যতলোক  আসবে যাবে প্রসাদখাবে সবার উপর নজর রাখবে। কারোর আচার আচরণ বা গতিবিধির উপর সন্দেহ হলেই আমাকে জানাবে। কাল সকালে বিশালবাবুর ঘরটা সার্চ করবো, আশাকরি কিছু একটা মিলবে"  বিক্রম জবাব দিল। 
 
 
বললাম,"দেবলীনা যে সিগনালটা রেকর্ড করেছিল সেটা ডিকোড করতে পারলে ? "
 
 বিক্রম পাশফিরল। এরপর  আবার চিৎ হয়ে শুয়ে ছাদের দিকে তাকিয়ে বলল," অনেকটাই। মনে হচ্ছে বিদেশী কোনও এজেন্সি এই সিগনাল পাঠাচ্ছে, যাদের উদ্দেশ্যে পাঠাচ্ছে তারা আশেপাশেই কোথাও আছে। যে দুজনকে ধরা হয়েছে তারা মুখ খুলছে না। ঘটিধোলাই পর্যন্ত দেওয়া হয়েছে। ওয়েল ট্রেনড।"
 
 
কথা আর বেশিদূর এগোল না, বিক্রম নিশ্চুপ হয়ে গেল। বুঝলাম মহামান্য বিক্রম মুখোপাধ্যায় নিদ্রাদেবীর সাধনায় সিদ্ধি লাভ করেছেন। অগত্যা আমিও একই পথ অনুসরণ করলাম।
সকালবেলা উঠেই পুজোর কাজে লেগে পড়লাম। সকাল সকাল স্নান করে নতুন জামা প্যান্ট পরে বিক্রমও রেডি। আজ আমার সঙ্গে আছে ভোলা। ভোলাকে আগে থেকেই সবকিছু শিখিয়ে পড়িয়ে রেখেছি। দুজনে মিলে নজর রাখলে কালপ্রিট নজর এড়িয়ে যেতে পারবে না।
 
 
 
 
(চলবে )