Saturday, October 5, 2019

সিংহবাহিনী রহস্য // পর্ব - ৩ সুব্রত মজুমদার

সিংহবাহিনী রহস্য // পর্ব - ৩  সুব্রত মজুমদার


দেবলীনা যথাসম্ভব জুম করে আলোটা রেকর্ড করল। ভিডিও কোয়ালিটি আহামরি কিছু না হলেও আমি নিশ্চিত বিক্রমের জন্য ওইটুকুই যথেষ্ট। বিক্রম আগে পুলিশে চাকরি করতো, তাই এরকম সংকেত নিয়ে সে অনেক কাজ করেছে। 
 
বিক্রমের হাত থেকে বাইনোকুলারটা নিয়ে আলোটা পর্যবেক্ষণ করতে করতে দেবলীনা বলল, "আমাদের কপালে নির্ভেজাল আনন্দ নেই। ভেবেছিলাম কাকুর দেশের বাড়িতে এসে জমিয়ে মস্তি করবো, তা নয় যত উৎপাত এসে হাজির। একের পর এক সাসপেন্স। ঠাকুরমশাইয়ের নাকের শিরা ছিঁড়ে যাওয়া, ঠাকুরদালানে সবার অস্বস্তি বোধ হওয়া, পাগলাটে ইঞ্জিনিয়ার, আর সবার শেষে তারারহস্য। ডিসগাস্টিং !"
 
অঘোরবাবু বিমর্ষ গলায় বললেন," এ সবের জন্য আমিই দায়ি । নেমন্তন্য করে তোমাদের ডেকে একটা অস্বস্তিকর পরিস্থিতিতে ফেলে দিলাম। "
 
বিক্রম অঘোরবাবুর হাত চেপে ধরে বলল," আমরা যথেষ্টই এনজয় করছি। আর রহস্য, সমস্যা, বিপদ এগুলো আমরা না চাইলেও এসে হাজির হবে, এতে আপনার কিচ্ছু করার নেই অঘোরবাবু।" 
রাত্রে খাওয়া দাওয়ার পর যে যার রুমে শুয়ে পড়লাম। অজানা জায়গায় ঘুম আসতে চায় না, কিন্তু আগের রাতে ভালো ঘুম হয়নি বলে আজ ঘুমটাও একটু তাড়াতাড়ি এল।
 
 
রাত তখন আড়াইটা কি তিনটে ভীষণ তেষ্টায় ঘুম ভেঙ্গে গেল, উঠে দেখলাম লোডশেডিং। বিছানায় আমি একা, বিক্রম নেই।
অন্ধকারে দৃষ্টি চলেছে না। ড্রয়ার হতে টর্চটা বের করে সিঁড়ি দিয়ে নেমে এলাম। উঠানে ঠিক নামার আগেই একটা বলিষ্ঠ হাত আমার মুখ চেপে ধরল। আমি চিৎকার করার চেষ্টা করলাম। কোনও আওয়াজ বের হল না। এতক্ষণে হাতটার মালিকের ফিসফিস আওয়াজ শোনা গেল, "একদম চুপ ! টর্চও জ্বালাবে না।"
 
 
আমি চাপা গলায় বলল, "বিক্রম তুমি !"
বিক্রম বলল, "দু'তিনজন  লোক ঠাকুরদালানের দিকে গেছে। আমি তাদের অনুসরণ করতে করতে এখান পর্যন্ত এসেই তোমার পায়ের আওয়াজ পেলাম। সাবধানে এগিয়ে চলো।"
 
 
আমি আর বিক্রম সাবধানে এগিয়ে চললাম। বিক্রমের একহাতে টর্চ আর অপরহাতে পিস্তল, আর আমি সম্পূর্ণ নিরস্ত্র। অন্ধকারেই এগিয়ে যেতে লাগলাম। উঠোন পেরিয়ে ঠাকুরদালানের বারান্দায় গিয়ে উঠলাম। এতক্ষণে অন্ধকার সয়ে গেছে, সবকিছুই কালো কালো আবছা আবছা দৃষ্টিগোচর হচ্ছে। একটা থামের পিছনে লুকিয়ে পড়লাম দুজনে। যত সময় যাচ্ছে প্রবল উত্তেজনায় শ্বাসপ্রশ্বাস দ্বিগুণতর হয়ে উঠছে।
 
দেখলাম দুটো ছায়ামূর্তি সিংহবাহিনীর মন্দিরের দিকে অগ্রসর হচ্ছে। তারপর তালা খুলে ভেতরে ঢুকল। ওদের একজন দরজার সামনে পাহারায় থাকলো আর অপরজন এগিয়ে গেল মা সিংহবাহিনীর দিকে। মা সিংহবাহিনীর দিকে হাত বাড়াতেই দ্বিতীয় ছায়ামূর্তি এগিয়ে গিয়ে প্রথম ছায়ামূর্তির কানে পিস্তল ঠেকিয়ে বলল, "একদম নড়বেন না, আমার লক্ষ্য কিন্তু অমোঘ। একদম খুলি ঝাঁঝরা হয়ে যাবে।" 
 
 
এ তো বিক্রমের গলা। আমি কাঁপা কাঁপা গলায় বলে উঠলাম, "বি-ক-র-ম্-ম্ !" 
চমকে উঠে আমার দিকে তাকাল বিক্রম, আর সেই সূযোগে ছায়ামূর্তিটি বিক্রমকে একটা প্রবল ধাক্কা দিয়ে বেরিয়ে গেল। ছায়ামূর্তির দিকে লক্ষ্য করে গুলি ছুড়ল বিক্রম। গুলি লাগল কি না বোঝা গেল না। কিন্তু একটা চাপা আর্তস্বর যেন শোনা গেল। আমি জিজ্ঞাসা করলাম," তুমি তো আমার সঙ্গেই ছিলে, আর সামনে ছিল ওই বদমাশ দুটো। কিন্তু হঠাৎ করে তুমি....
 
বিক্রম বলল, "আরেকটাকে অজ্ঞান করে রেখে এসেছি। তুমি যখন সামনের লোকটার দিকে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে ছিলে ঠিক তখনই আমি পেছনের লোকটাকে অজ্ঞান করে তার জায়গা নিই। মানসিক একাগ্রতা আর অন্ধকারের জন্য তুমি টের পাওনি। মানসিক একাগ্রতা সবসময় সহায়ক হয় না, এতে ফোকাসের আশেপাশের বস্তু ও ঘটনা চোখ এড়িয়ে যায়। "
 
 
 
বিক্রমের সঙ্গে টর্চনিয়ে অকুস্থলে গিয়ে দেখলাম যার অজ্ঞান হয়ে পড়ে থাকার কথা তিনি পালিয়েছেন। বিক্রম বলল," পালিয়েছে। চল, গুলি ঠিক জায়গায় লাগলো কি না দেখি। "
দুটো টর্চ দিয়ে প্রতি ইঞ্চি পরীক্ষা করে দেখতে লাগলাম। হ্যাঁ, রক্তের দাগ দেখা যাচ্ছে। রক্তের দাগ  সদর দরজা পেরিয়ে ঘাঁসের জমিতে নেমেছে। তারপরেই হঠাৎ করে রক্তের দাগ অদৃশ্য। বললাম, "এবার কি করবে ?" 
 
 
বিক্রম বলল," ভাগতি হুয়ে চোরকি লঙ্গট হি সহি। এই রক্তের দাগ অনেক প্রশ্নের উত্তর দেবে। জাস্ট ওয়েট অ্যণ্ড ওয়াচ। বাবা বদ্যিনাথের ঘোড়া পালিয়ে যাবে কোথায় ! " 
 
 
-তিন-
 
 
সকালে উঠেই দেখলাম ঢাকিরা এসে হাজির। উঠোনে চার চারজন ঢাকির ঢাকের আওয়াজে কানের পোকা বের করে দিচ্ছে। অঘোরবাবুর ব্যবস্থাপনা যথেষ্টই ভালো। ক্যাটারারের কাছ হতে প্লাস্টিকের চেয়ার, শতরঞ্জি ইত্যাদির যথেষ্ট পরিমাণে ব্যবস্থা করে রেখেছেন।
 
 
সাদা ধুতি আর ফুলহাতা সাদা স্যাণ্ডো গেঞ্জি পরে অঘোরবাবু চড়কিপাক ঘুরে বেড়াচ্ছেন। আমাকে দেখে বললেন, "এই যে সায়ক ভায়া, একটু দেখেশুনে নিও। তোমরাই আমার অবলম্বন। বিক্রম ঠাকুরঘরটা দেখছে, রান্নাবান্না আর খাওয়া দাওয়াটা তোমার দায়িত্ব। দেবলীনা আর আমি অন্যদিকগুলো দেখছি।"
 
 
একটু এগিয়েই দেখলাম দক্ষিণের টিন দেওয়া বিশাল চালাতে রান্নার ঠাকুর গ্যাসের উনুন জ্বালিয়ে ব্রেকফাস্ট তৈরিতে ব্যস্ত। ঘুঘনি, মুড়ি আর বোঁদে। রান্নার ঠাকুরের সঙ্গে তিন চারজন হেল্পার। আমি যেতেই কাগজের কাপে করে চা আর বিস্কুট এগিয়ে দিল। একপাশে রাশিকৃত আলু পটল বেগুনের মতো সব্জি।
 
 
কিছুটা এগিয়ে গিয়ে দেখলাম একটা পনেরো ষোলো বছরের ছেলের সঙ্গে দেবলীনা ঘুরে ঘুরে অতিথি আপ্যায়ন করে বেড়াচ্ছে। আমাকে দেখে একটা মিষ্টি হেসে দেবলীনা বলল, "খুব ব্যস্ত সায়ক । এই দেখ আমার সঙ্গি, ভোলা, - খুব মিষ্টি ছেলে।"  আমি ভোলার গালটা টিপে দিয়ে বললাম, "সো সুইট ! আমি রান্নাঘরের দায়িত্বে আছি, প্রয়োজনে ডেকো।" 
 
 
ব্রেকফাস্ট তৈরি হওয়ার পর দুপুরের রান্না চাপবে। আলুপটলের তরকারি, আলুপোস্ত, মুগের ডাল, ভাজা, চাটনি, পায়েস আর মিষ্টি । সব বন্দোবস্ত করে বিক্রমের কাছে গিয়ে দেখি বিক্রম শোলা কেটে  মন্দিরের ডেকোরেটিং করছে। ঘিয়ে পাড় গরদের ধুতি আর গণেশের ছবি আঁকা খয়েরি টানের পাঞ্জাবিতে অত্যন্ত আকর্ষণীয় লাগছে বিক্রমকে। আমাকে দেখে বিক্রম বলল, "তোমার ওদিককার কাজ কতদূর ?" 
 
 
আমি বললাম, "ইচ্ছা করলে ব্রেকফাস্ট করে আসতে পারো। সব রেডি হয়েই আছে।" 
বিক্রম হেসে বলল, "অতটা পেটুক এখনো হইনি রে ভাই। পুজো হয়ে গেলে একেবারে দুটো ডাল ভাত খাবো।"   আমি আর কিছু বললাম না। বিক্রম যে এত একনিষ্ঠ তা আগে জানা ছিল না। 
 
 
 
দুপুরে খাওয়া দাওয়ার সময় আমার ব্যস্ততা বেড়ে গেল। কার পাতে কি পড়ছে না, কে এখনো খায়নি, পরিবেশনের ছেলেদের পরিচালনা ইত্যাদি নানান কাজে যখন আমার প্রাণান্তকর অবস্থা ঠিক তখনই বিক্রম আমাকে ঈশারা করে একটা লোকের দিকে দেখালো। লাইনের একেবারে শেষে বসেছে লোকটা। লোকটার মুখোমুখি বসে আছে স্বয়ং বিক্রম। পরিবেশনের একটা ছেলের হাত হতে ডালের বালতিটা নিয়ে এগিয়ে গেলাম। বিক্রমের মুখোমুখি হতেই চাপা গলায় বলল, "লোকটার দিকে নজর রাখ। এই সেই ইঞ্জিনিয়ার, অঘোরবাবুর ভাইপো।"
 
 
চল্লিষোর্ধ লোকটার পোষাকপরিচ্ছদে তেমন কোনও বাহুল্য নেই। একটা সাধারণ টিশার্ট আর প্যান্ট, চোখে হাইপাওয়ারের চশমা। ডালের বালতিটা নিয়ে লোকটার কাছে গেলাম। আমি যেতেই উনি আমার দিকে তাকিয়ে বললেন, "আপনারা অঘোরকাকুর গেস্ট ! সায়কবাবুর গল্পে আপনাদের কীর্তিকাহিনীর কথা পড়েছি।"
 
 
সবিনয়ে জানালাম যে আমিই সায়ক। উনি আমার পরিচয় পেয়ে কিছুক্ষণ চুপ করে কি ভাবলেন, তারপর বললেন, "আপনার সঙ্গে আমার কিছু কথা ছিল, কিন্তু এখনই নয়, সময়মতো বলবো।"  আমি  ডালের বালতি নিয়ে সামনে এগিয়ে গেলাম।
বিকেল বেলায় মৃণ্ময়ী প্রতিমা মণ্ডপে আনা হল। ঠাকুরমশাই মহাষষ্ঠীর পুজা শুরু করলেন। বেলগাছের তলায় হল মায়ের বোধন।  দেবলীনা গাইলো, 'গিরি গণেশ আমার শুভকারী..."। 
 
 
 
(চলবে )