Sunday, September 8, 2019

শেষ নাই যার // পর্ব - ৯ // সুব্রত মজুমদার

শেষ নাই যার  //  পর্ব - ৯  // সুব্রত মজুমদার




আমি অঘোরবাবুর কাছে গিয়ে দাঁড়ালাম, বিক্রম অঘোরবাবুকে একটা জোরসে ধাক্কা দিলো। অঘোরবাবু ধাতস্থ হয়েই চোখ মিটিমিটি করে বললেন, "এক্ষুনি আমার আঙুলটা গিয়েছিল মশাই !" 
বিক্রম বলল, "ভাবিয়া করিয়ো কাজ, করিয়া ভাবিয়ো না। এই অতি তাড়াহুড়োই আপনাকে একদিন ডোবাবে অঘোরবাবু।" 
 
 
অঘোরবাবু অপরাধীর মতো মুখ করে চেয়ে রইলেন। বিক্রম মেঝের উপর বসে পড়ল। তারপর স্যাক হতে জলের বোতল বের করে গলাটা ভিজিয়ে নিয়ে বলল," এই পাত্রগুলোর মধ্যে যেকোনো একটা পাত্র বিশেষ এক রাসায়নিকে পূর্ণ, এই রাসায়নিক দেবে দিব্য দৃষ্টি। "
 
 
দেবলীনা বিক্রমের থুতনিটা ধরে বলল," কিন্তু এ তত্ত্ব তুমি জানলে কিভাবে বস ?"  বিক্রম দেবলীনাকে কাছে টেনে নিয়ে বলল, "তোমার দু'চোখে।" 
"আমার দু'চোখে ?.. সেখানে তো তোমার মরণ লেখা আছে ডারলিং। "
 
 
" ওই দু'চোখেই আমি তলিয়ে যেতে চাই। "  দুজন দুজনকে জড়িয়ে ধরে। অঘোরবাবু দেওয়ালের দিকে মুখ করে বসে বসে কাশতে থাকেন। আমি কি করব ভেবে পেলাম না। সম্বিত ফিরে পেতেই দেবলীনাকে বাহুমুক্ত করে বিক্রম উঠে দাঁড়াল। তারপর দেওয়ালে উৎকীর্ণ একটা লিপির দিকে দেখিয়ে বলল, "এই দেওয়াল লিপি বলছে। "
আমি বললাম," এটা তো ব্রাহ্মী লিপি।" 
 
 
বিক্রম আমার দিকে না ঘুরেই জবাব দিল, "একদম ঠিক বলেছ সায়ক। ব্রাহ্মী লিপি, তবে ভাষাটা প্রাকৃত নয়, সংস্কৃত। তিব্বতের মনেস্ট্রিতে থাকার সময় পালি, সংস্কৃত এসব ভাষার মতো ব্রাহ্মী, তিব্বতির মতো লিপিও শিখেছিলাম। পুরানো সব পুঁথিপত্র পড়তে এইসব লিপি কাজে লাগে।"
"প্রাকৃত আর সংস্কৃতের গোলমালটা আমার মাথায় ঢোকে না, সব গুলিয়ে যায়। " আমি আমার দূর্বলতা লুকোলাম না। 
 
 
বিক্রম অভিজ্ঞ মাষ্টারমশাইয়ের মতো বলল, "  ইন্দোইউরোপিয়ান ভাষাগোষ্ঠীর মধ্যে সংস্কৃতই সবচেয়ে শক্তিশালী ভাষা। এই সংস্কৃতের জঠর হতেই বাংলা, হিন্দি, গুজরাতি প্রভৃতি ভাষার জন্ম। 
      বৈদিক সংস্কৃত হল 'GOD GIFTED' ভাষা । দেবতারা যখন আবার ফিরে আসবেন তখন যাতে এই ভাষার বিশুদ্ধতা বজায় থাকে তার জন্য অনেক নিয়ম নীতি প্রণীত হয়। আর এই নিয়ম নীতই হল ব্যাকরণ। কাত্যায়ণ, অশ্বলায়ন, গোভিল প্রভৃতি বৈয়াকরণ বৈদিক সংস্কৃত ভাষাকে সমৃদ্ধ করলেও বেদ পরবর্তী সংস্কৃতের একমেব অদ্বিতীয় বৈয়াকরণ হলেন পাণিনি । তিনি লাহোরে জন্মগ্রহণ করেন। অষ্টাধ্যায়ী ব্যাকরণ লিখে তিনি বিখ্যাত হন।     
 
 
         এই পাণিনির সময় হতেই সংস্কৃতের বিকৃতি শুরু হয়। প্রাদেশিককতা, জিহ্বার জড়তা, অশিক্ষা, ইত্যাদি কারণে সংস্কৃত শব্দ বিকৃত হয়ে তদ্ভব শব্দের সৃষ্টি হয়। 'তদ্ভব' মানে 'তাহা হইতে উৎপন্ন' অর্থাৎ সংস্কৃত হতে উৎপন্ন। যেমন ছত্র >ছাতা, কর্দম>কাদা, ইত্যাদি। এছাড়াও অনেকরকম বিকৃতি লক্ষ্য করা যায়। 
 
 
সংস্কৃতের বিকৃতির ফলেই প্রাকৃত ভাষার জন্ম হয়। এই প্রাকৃত ভাষা আবার পাঁচ প্রকার, মহারাষ্ট্রী, শৌরসেনী, মাগধী, অর্ধমাগধী ও পৈশাচী। "
 
"থাক থাক মশাই , এটুকু জ্ঞানই যথেষ্ট। ব্রাহ্মী আমার ব্রহ্মতালু বিদীর্ণ করে দেবে।"  অঘোরবাবু বিক্রমকে মাঝপথে থামিয়ে দেন। এদিকে দেবলীনা এক কাণ্ড করে বসে। আমরা যখন প্রাকৃতর প্রকৃতি নিয়ে বকরবকর করছিলাম দেবলীনা তখন টর্চটা নিয়ে সে আনমনে খেলা করছিল। অসাবধানে টর্চের আলোটা সিলিংয়ের উপর পড়তেই এক অদ্ভুত রঙের জালে গোটা কক্ষ ভরে যায়। বিক্রম উত্তেজিত হয়ে বলল, "টর্চটা একদম নাড়াবেনা। দেখ সায়ক দেখ, আমাদের তরলরহস্যের সমাধান দেখ। " 
 
 
আমি ভালোভাবে লক্ষ্য করলাম, গুহাকক্ষের সিলিংয়ের মাঝখানে একটা স্ফটিক লাগানো আছে। টর্চের আলো সেই স্ফটিককে প্রতিফলিত হয়ে বিভিন্ন শাখায় ভাগ হয়ে পূর্ণপাত্রগুলোতে পড়েছে। এক একটা পাত্রে এক এক রঙের আলো পড়েছে। 
" কিছু বুঝলে ? "
 
 
" না। " আমি অসহায়ভাবে জবাব দিলাম। অঘোরবাবু বললেন, "ছোটবেলায় পড়েছি মশাই, প্রিজমের উপর সাদা আলো পড়লে তা সাতটি বর্ণের ভেঙ্গে যায়।" 
বিক্রম বলল, "ভালো করে দেখ সায়ক, একমাত্র নীল আর হলুদ বাদে অন্য রঙের আলোগুলো জোড়ায় জোড়ায়। অঘোরবাবু, নীল আর হলুদ বর্ণের আলো পড়েছে যে দুটো পাত্রে সেই পাত্রদুটো সাবধানে তুলে আনুন। "
 
 
অঘোরবাবু পাত্রদুটো তুলে এনে বিক্রমের হাতে দিলেন। বিক্রম দুটো পাত্রের তরল মেশাতে মেশাতে বলল," হলুদ আর নীল মিলে হল... "
".. সবুজ। "   দেবলীনা চটজলদি জবাব দিল। 
 
 
বিক্রম বলল," আর এই সবুজ মানেই জীবন। " এই বলে মিশ্রিত তরলটা ঢকঢক করে খেয়ে নিল বিক্রম। অঘোরবাবু আর দেবলীনা বাধাদেবার জন্য ছুটে এল, কিন্তু ততক্ষণে সব তরল বিক্রমের পেটে।  আমরা সবাই চরম উৎকণ্ঠায় বিক্রমের দিকে তাকিয়ে আছি, বিক্রম চোখের পলক ফেলছে না। এক এক সেকেন্ড এক এক দিনের থেকেও বড় মনে হচ্ছে। হঠাৎ বিক্রমের মুখে হাসির রেখা দেখা গেল। 
 
 
বিক্রম একচোট হেসে নিয়ে বলল, "আই এম অলরাইট ! তবে এই পোশনটা খাওয়ার পর হতে তোমরা যা দেখতে পাচ্ছ না আমি তা দেখতে পাচ্ছি।"  এই বলে দেওয়ালের একটা জায়গায় হাত ঢুকিয়ে দিল। তারপর দেওয়ালের ভেতর হতে বের করে আনল নীল বর্ণের একটা স্ফটিক ড্রাগন। নীল রঙের দ্যূতিতে সারা ঘর ভরে উঠল। 
দেবলীনা বলল, "লাল ড্রাগনের জোড়াটা...! "
 
 
বিক্রম বলল," হ্যাঁ ডারলিং। এবার বেরোতে হবে, আমার সঙ্গে এস । "
আমরা বিক্রমকে অনুসরন করলাম। গুহার দেওয়ালের একটা অংশের কাছে এস বলল, "এই হল দরজা, এস..।" 
আমরা বিক্রমের সঙ্গে দেওয়ালের দিকে এগিয়ে গেলাম। আশ্চর্যজনকভাবে দেওয়াল বরাবর একটা আলোকনির্মিত দরজা দেখা গেল। আমরা অনায়াসে পেরিয়ে গেলাম সেই দরজা। 
 
 
                                                          - - পাঁচ--
 
আলোর  দরজা পেরিয়ে যেখানটায় এসে পৌঁছালাম সেই জায়গাটা আমাদের খুবই চেনা। একটা বাগান। বাগানের দেশি গোলাপের ঝোঁপটা ছেঁটে দিচ্ছে একজন মধ্যবয়স্ক লোক। লোকটার নজর আমাদের দিকে পড়তেই একগাল হেসে বলল, "বিক্রম দাদাবাবু যে। কখন এলেন আপনারা ? সেই কখন আমি দরজায় খিল এঁটে দিয়েছি, আপনারা ঢুকলেন কিভাবে ?" 
অঘোরবাবু কিছু বলতে যাচ্ছিলেন, বিক্রম তাকে থামিয়ে দিয়ে বলল, "সে কথা পরে হবে মাধবদা, এখন আমরা খুব ক্লান্ত, ফ্রেশ হয়ে নিই, তুমি ভাত বসিয়ে দাও।" 
 
 
ঘন্টাদুয়েকের মধ্যেই মাধবদার ডাক এল,"খাবার রেডি চলে আসুন সবাই। "   দীর্ঘ কয়েকদিন পর মাধবদার হাতের রান্না খেলাম। গরম গরম ভাত, ঘি, গন্ধরাজলেবু, আর হাঁসের ডিমের ঝোল।
বিকেল বেলায় চায়ের টেবিলে বিক্রম বলল,"নীল ড্রাগনটা তো পেলাম, কিন্তু ড্রাগনদুটো নিয়ে কি করব ? এদিকে ডাকাতসর্দারও কিছু একটা চাইছে,... হুমম্.... কেস সিরিয়াস অঘোরবাবু।" 
 
 
অঘোরবাবু ড্রাগনদুটো নিয়ে নাড়াচাড়া করছিলেন, তিনি গম্ভীর গলায় বললেন, "জটিল কেস ভায়া !" অঘোরবাবুর মুখের দিকে চেয়ে দেবলীনা বলল,"তাইতো !"  ঠিক এসময় বিক্রমের ল্যাণ্ডফোনটা তীব্র আক্রোশে ফেটে পড়ল। বিক্রম উঠে গিয়ে ফোনটা ধরল। কিছুক্ষণ হুঁ হ্যাঁ করার পর কথা শেষ করে আবার ফিরে এল। 
 
 
দেবলীনা বলল, "কি হয়েছে বিক্রম, অ্যানিথিং রং ? 
বিক্রম বলল, "নেহানবাবুর ফোন। উনার গুরুদেব কাশী হতে ফিরেছেন, আমার সঙ্গে দেখা করতে চান। ড্রাগনদুটোও দেখতে চেয়েছেন উনি। "
অঘোরবাবু চেয়ার হতে উঠে পড়লেন। বললেন,"চলি, কাল একেবারে দেখা হবে নেহানবাবুর বাড়িতে ।"  
 
 
সেদিনকার মতো চায়ের আসর ভেঙ্গে গেল। আমিও বাড়ি চলে এলাম। আসার সময় বিক্রম বলল,"মনে হচ্ছে রহস্যের জট কিছুটা আলগা হয়ে এসেছে, চল কাল গুরুদর্শন করে আসি।"
 
 
 
পরেরদিন যখন নেহানবাবুর বাড়ি গিয়ে পৌঁছলাম তখন সকাল ন'টা। তিনতলার উপরে নেহানবাবুর ফ্ল্যাট। কিচেন, ডাইনিং, তিন তিনটে রুম সহ বিশাল ফ্ল্যাট। লিফটে ওঠার পর  বাঁদিকে ৩০৫ আর ৩০৬ নাম্বার। নেমপ্লেটে জ্বলজ্বল করছে, -' নেহান রায়চৌধুরী, পদার্থবিদ '  ইত্যাদি ইত্যাদি। কলিংবেল টিপতেই নেহানবাবু দরজা খুলে বেরিয়ে এলেন। পরনে লাল ধুতি, গলায় রুদ্রাক্ষের মালা, গায়ে লাল অঙ্গবস্ত্র। একজন পদার্থবিদের এহেন বেশভূষা মেনে নিতে পারলাম না।
 
 
 
... চলবে