Friday, September 27, 2019

এতাল_বেতাল_ভাবনার_মাঝে_চা_জুড়িয়ে_জল // শুভ্র ঘোষ




আজ সকালে পাড়ার চায়ের দোকানে আদা দেওয়া চা এর স্বাদ নিতে নিতে শুনলাম, দুইজন বয়স্ক মানুষ, একে অপরকে বলছেন;

অ ~'বুঝলে হে, ইংরেজরা চলে গেছে অনেককাল হল!কিন্তু তাঁদের প্রেতাত্মারা রয়ে গেছে এখনোও...'

সেই শুনে আরেকজন বললেন,

ক ~ 'হ্যাঁ, আর এদিকে বিদ্যাসাগর বঙ্কিম বিবেকানন্দরা চলে যেতেই কি কলিকাল এল!
বাঙালীর বাংলা ভাষায়, ফাটল ধরল বড়সড়'।

ওদের কথা শুনে ভাবলাম, সত্যি তো, গেঁয়ো যোগী কদর পায় না কেন??? 
হয়ত আমরাই তাঁদের সঠিক সময়ে চিনতে পারি না, তাই। 
তখনই মনে পরে গেল মহাকাব্য মহাভারতের একটি ছোট ঘটনা;

কুরুক্ষেত্র যুদ্ধের কিছুদিন আগে শ্রী কৃষ্ণ, পান্ডব এবং কৌরব পক্ষের একজন করে প্রতিনিধিকে আমন্ত্রন জানালেন। আমন্ত্রনে বলা ছিল, যে আগে কৃষ্ণের কাছে এসে পৌছাবেন তিনি যুদ্ধ সংক্রান্ত যা চাইবেন তাই পাবেন।

নির্ধারিত সময়ে, দুর্যোধন এবং অর্জুন দ্বারকানগরী তে পৌছান। দুজনেই পৌছে দেখেন, একটি আসনে গা এলিয়ে মাধব নিদ্রাসনে বসে আছেন। 

দুর্যোধন বাসুদেবের মাথার পাশের আসন গ্রহন করলেন। অর্জুন কেশবের পায়ের কাছে বসলেন। এরপর দুজনেরই একসাথে বেশ কিছুক্ষণ অপেক্ষার পর, কানাই এর নিদ্রাভঙ্গ হয়।


চোখ মেলে তিনি অর্জুনকে আগে দেখে, তাঁকেই আগে চাইতে বললেন। বিনয়ীবীর গুঢ়াকেশ তাঁর থেকে বয়সে বড় ভাই দুর্যোধনকে, সেই দায়ীত্ব সঁপে দিয়ে, তাঁকে আগে যাচনা করতে বললেন। 


দ্বারকাপতি আগেই শর্ত দিয়ে রেখেছিলেন, যে এই যুদ্ধে তিনি অস্ত্র ধারন করবেন না এবং বিনাঅস্ত্রে যুদ্ধ করবেন না। তাই কুটিল দুর্যোধন ভাবলেন কি হবে অস্ত্রহীন হৃষীকেশ কে নিয়ে! তিনি নিজ ভাবনানুসারে এক অক্ষৌহিনী নারায়নী সেনাকে চয়ন করলেন। ওদিকে অর্জুন না চাইতেই ইপ্সিত ফল পেয়ে শান্ত রইলেন।


এ অবধি কমবেশী সবারই জানা। কিন্তু এই গল্পটি বলার কারন যা,সেটি ঘটেছিল এর পরে হস্তিনাপুরে পান্ডবমাতা কুন্তীর ঘরে।

সেই রাতে অন্ধ ধৃতরাষ্ট্র দুর্যোধনের চয়নে আনন্দিত হয়ে, কুন্তীকে 'কথা' শোনাতে এলেন,তাঁর কাছে। এসে নিজ পুত্রের নানারকম স্তুতি প্রশংসা করে, কুন্তীকে বললেন, 'তোমার ছেলেদের আর কবে বুদ্ধি গজাবে? দুরযোধন তো তোমার ভাইপো দ্বারকাধীশকে শূণ্য করে দিয়ে এসেছে। এরপরেও যুদ্ধ করবে?'

কুন্তী সমস্ত ঘটনা শুনে ধৃতরাষ্ট্রকে বললেন, 'যিনি নারায়ণী সেনার সৃষ্টিকর্তা তিনি স্বয়ং আমার পুত্রদের সাথে আছেন। আপনার কবে জ্ঞান হবে, তাঁর শক্তি সম্বন্ধে?'


ধৃতরাষ্ট্র মাথা নীচু করে চুপচাপ চলে গেলেন। এবার দুর্যোধনের কাছে গিয়ে, তাঁকে গালমন্ন্দ শুরু করলেন। কারন,  সে কেন গোবর্দ্ধনধারীকে ছেড়ে তাঁর নারায়ণী সেনা কে চয়ন করেছিল,তাই।

এবার বলি, এই গল্পটিতে কিছু কাল্পনিক সংলাপ মিশ্রিত করে বলার কারন, আমাদের মাতৃভাষা! আমাদের বাংলা ভাষা। আমাদের আপন ভাষা।মায়ের ভাষা।


 হস্তিনাপুর রাজ জন্মান্ধ ছিলেন। তাই তিনি হয়ত কানপাতলা স্বভাবের ছিলেন! নিজস্ব বিচারবোধ তাঁর ছিল না। তাই জন্যই দুর্যোধনের কাছে নারায়নী সেনা প্রাপ্তির কথা শুনে কুন্তীকে কথা শোনাতে গেছিলেন এবং কুন্তীর কাছে শুনে দুর্যোধনকে কথা শুনিয়েছিলেন।

সত্যি এটাই যে, মহাকাব্য মহাভারতের পান্ডব এবং কৌরব, দুই স্বভাব গুণ আমাদের মধ্যে আজো বর্তমান! সময় অসময়ে ক্ষেত্র বিশেষে, তা নিজ রূপ ধারণ করে স্বপ্রকাশিত হয়। প্রতিনিয়ত এদের আমরাই নিজেদের অজান্তে লালন পালন করে চলেছি,আমাদেরই অন্তরে।


তাই আদা দেওয়া চা পান করতে করতে গল্প শুনিয়ে,  সতর্ক করে দিয়ে বলি, বর্তমানে যেভাবে বাংলা বাঙালী এবং বাঙালীয়ানা বিকৃত হচ্ছে,বিকৃত জ্ঞানের মাধ্যমে। সতর্ক থাকুন সজাগ থাকুন! নিজেদের অন্তরে ধৃতরাষ্ট্র কে পালন করবেন না! তাকে পাত্তা দিয়ে সংস্কৃত ভাষার মতন আমাদের আপনভাষা বাংলা ভাষাকে, লুপ্তপ্রায় ভাষায় পরিবর্তন করবেন না।


আপন কে চিনতে শিখুন। আপনের সাথে থাকুন। 

অবশেষে, মহাকবি মাইকেল মধুসূদন দত্তের মেঘনাদ বধের একটি লাইন লিখে শেষ করব এই লেখা ;

"...শাস্ত্রে বলে,গুণবান্ যদি 
পরজন,গুণহীন স্বজন, তথাপি 
নির্গুণ স্বজন শ্রেয়,পরঃ পরঃ সদা..."।

ভালো থাকবেন ভালো রাখবেন।