Tuesday, September 3, 2019

দুর্গাপূজার একাল সেকাল // সত্যেন্দ্রনাথ পাইন

দুর্গাপূজার একাল সেকাল  //   সত্যেন্দ্রনাথ পাইন

ত্বং স্বাহা ত্বং স্বধা ত্বং হি বষটকারঃ স্মরাত্মিকা
সুধা ত্বমক্ষরে নিত্যে ত্রিধামাত্রা স্থিকা স্থিতা।
 পূজা। পূজা মানে কী? পূজা কাকে বলে? শরীর ও মনের মধ্যে আন্তরিক বোঝাপড়া? শুধু বাহ্যিক আড়ম্বরে যেমন ফুল ফোটে না, ফল ও ধরবে না তেমনি ভালবাসা বিস্তার পায় বুকের ভেতর থেকে ভ্রূণ মুকুলের স্তর পেরিয়ে তরতর করে বেড়ে ওঠা যেমন-- পূজা ও তেমনি মনের জানালা খুলে অনুভূতি কে সূক্ষ্ম হৃদয়বোধের বহনযোগ্যতা দেওয়া বোঝায় ।উদাসীন খ্যাপামি নয়, মস্তিষ্কের গুমোটকে   শীতলতা দেওয়া এক তৃপ্তির স্বাদ।
     আমরা পূজা করি। রাজা সুরথ অকালবোধন পূজোটাকেই শারদীয়া দুর্গাপূজায় রূপান্তরিত করেছেন। সেই পূজোটাই বর্তমানের দুগ্গো পুজো। যেখানে আজ নেই ভক্তি, নেই গরিমা-। শুধুই থিম্। মাঝখানে বয়ে যায় - একঝলক প্রেমের মৌসুমী বায়ু।
  সেকালের রাজবাড়ির পূজা, জমিদার বাড়ির পূজোয় ছিল স্পেসহীন বনেদীয়ানা। বারোয়ারী পূজাতেও ছিল কেতাদূরস্ত সদ্ভাব। তখন পূজায় চমক ছিলনা; গিমিক ছিল না। গরিমা ছিল। সম্পর্কের বাঁধন ছিল। নিছক হিড়িক ছিলনা।
তখন আপামর জনসাধারণের মধ্যে মান্যতা দেবার  ঝোঁক ছিল দুর্গা পূজার আঙ্গিক। ডোম, মুচি, মেথর, ধোপা, নাপিত থেকে উচ্চবর্ণ ব্রাহ্মণ পর্যন্ত সকলেই ছিলেন সাবলীল নৈবেদ্য র উপচারের সামিল। এমনকি বারবনিতাদেরও সমান সম্মান দিতে তাদের দুয়ারের  মাটি নেবার চল ছিল। অর্থাৎ দুর্গা পূজার অছিলায়  সক্ষম ব্যক্তি যেন সমাজের প্রতি অর্থবহ সামর্থ্যে কিছু দান খয়রাতি করেন।
এখন কি সেটার সম্বন্ধে কেউ আমরা মাথা ঘামাই?  বরং এড়িয়ে গিয়ে বলি-- জাতপাত আবার কি? আমাদের আজ সত্যিই কী অব্যর্থ উপলব্ধি এবং অজ্ঞাত অদ্ভুত প্রাণন!! পূজা তো করি না পুজো করি‌। মনে পড়ে--- খড়ের প্রতিমা পূজিস রে তোরা/ মাকে তো তোরা পূজিস নে।/
প্রতিমার মাঝে প্রতি মা বিরাজে/হায়রে অন্ধ বুঝিস নে..... অর্থাৎ এখন একটা খ্যাপামি, জ্যাঠামি মিশ্রিত ছেলেমানুষী এবং অর্বাচীন ঔদ্ধত্য আছে--- যা মেনে নেওয়া খুবই কঠিন। হাওয়া আছে, মৌসুমী হাওয়া। কাশফুলের অজ্ঞাত ভাবপ্রবনতা আছে। কিন্তু মুগ্ধতা নেই।
     কোটি কোটি টাকা ব্যয়ে মূর্তি তৈরী হচ্ছে। প্যাণ্ডেল হচ্ছে। আলোর চোখরাঙানিতে চোখের
ভাবমূর্তি বিদীর্ণ হচ্ছে। নির্লিপ্ততা বাসা বাঁধছে। মৃত্যু চিৎকারের স্বপ্নে
বাঙালির গায়ে ক্ষতদাগ সৃষ্টি করছে।
   তখনকার পূজোর প্রতিমা ছিল একচালে সীমিত। এখন ছন্নছাড়া। অর্থাৎ তখন মানুষ সংঘবদ্ধতা পছন্দ করতেন হৃদয় দিয়ে আর এখন আশ্চর্য জনক ভাবে অনু পরিবারে বিবর্তিত হয়ে রাত্রির আকাশে ছড়িয়ে থাকা নক্ষত্রের মতো একলা হতে চাইছে। আশ্চর্য সমাজের বিবর্তন।
     সেদিনের পূজায় ছিল আন্তরিক বহুমুখীনতা; এখনের পুজোয় একমুখীনতা‌ লক্ষ্য করি। পূজা- উৎসবে প্রায়ই ভুলে যাই অব্যার্থ ব্যঞ্জন। ট্র্যাজেডি ছাড়া আর কিই বা বলা যাবে ? এটা অন্তহীন শোকাহত ও বিষাদতিক্ত বলেই মনে হয় আমার।
     তার ওপর এখন ক্ষমতার অলিন্দে গোষ্ঠী বা রাজনীতির ভয়ংকর উপস্থিতি পূজাকে পূর্ণগ্রাস সূর্যগ্রহণের মত পূজা- অবহেলা ও গরম যোগ্যতায় জোরে চড় কষিয়েছে জোরে।
     সুখের কথা; আনন্দের কথা-- ভারতবর্ষের বাইরেও এই দুর্গা পূজার চল ঘটেছে। প্রায় মাস ছয়েক আগে থেকেই প্রবাসী বাঙালিরা পুজোর আচ পেতে চেয়ে আনন্দ উপলব্ধি করে। ইউরোপ আমেরিকাতেও গুণমুগ্ধ বাঙালি হৃদয় দুর্গা পুজো নিয়ে সুখস্মৃতি রচনা করে। কিন্তু সেখানেও যেন প্রগাঢ় শ্রদ্ধা থেকে প্রাচুর্যের অহমিকায় সংকীর্ণতা মূর্ত করে। ভারতীয় তথা বাঙালি সংস্কৃতির উপচে পড়া ভাবনায় ছোট্ট বাক্সে বন্দী করে রাখে।
      আধুনিক পৃথিবী বিচ্ছিন্ন অধ্যাত্মবাদকে আর তাই মান্যতা দেয়না। স্বামী বিবেকানন্দের অধ্যাত্মবাদ, যোগদর্শন, বেদান্তদর্শন সেই মুগ্ধতা কে সরাসরি অবহেলায় ঠাট্টা করে।তাই আগের দুর্গা পূজা এখন ক্রমশই ধূসর হতে চলেছে। তবু বলি----
রূপং দেহি জয়ং দেহি যশোর দেহি দ্বিষো দেহি।
  -- হে মা বিশ্বজননী পরমারাধ্যা
 তবু শেষে বলতেই হয় বাঙালি মনের যে শিল্পী সত্তা সেটা যেন প্রতিমার গঠনে এবং পূজা মন্ডপের রূপসজ্জায় বাঙালিকে বিশ্বদরবারে নতুন করে প্রশংসা এনে দিচ্ছে।
যদি ও সেগুলোকে সংরক্ষণ করা সম্ভব হচ্ছে না তবু বিশ্বব্যাপী পূজা দিনগুলোতে বাঙালির উচ্ছ্বাস এবং অদ্ভূত কন্ঠস্বরে আরম্ভের দ্যোতক ও তড়িতের দ্যূতিতে নবসূচনার যোগসূত্র রচনা করে বৈকি।
 আর এবছর ১৪২৬ বঙ্গাব্দের বলা বাহুল্য ১৭ কোটি টাকা ব্যয়ে যে দুর্গা মূর্তি হচ্ছে তাকেও উন্মাদনায় না রাঙিয়ে উপায় কী।  !!( সন্তোষ মিত্র স্কোয়ারে সোনার মূর্তি)!!!!