Wednesday, August 14, 2019

নীলাময় চোখ // যাকারিয়া আহমদ

নীলাময় চোখ যাকারিয়া আহমদ

 
পাড়ার সব লোকে জানে এই পাড়ার সবচেয়ে সুন্দরীশ্রেষ্ঠা নারী নীলা। ঠিক নীল আসমানের মতো আটকে চক্ষুষ্মান যুবকের চোখে। অনেক যুবক নীলাকে দেখে দাঁড়িয়ে যায় এবং ভাবতে থাকে নিজেকে কীভাবে নীলাময় করা যায়। কিন্তু প্রস্তাব করে না কেউ তার বাবার ভয়ে। নীলার বাবা আদালত পাড়ার লোক। বেশকম হলে কমপক্ষে দশ মামলার আসামি হতে হবে।
 
মধ্যবিত্ত পরিবারের ছেলে আলম। তারা ছয় ভাই। আলম সবার বড়। সে ভদ্র ও কর্মব্যস্ত মানুষ। পাড়ার মানুষের মুখে তার একটা নামদাম আছে। কারও কষ্ট হবে এমন ভাষা সে ব্যবহার করে না মুখে। আলমেল মা বৃদ্ধমানুষ। আগের মতো ঝটপট করে পাকসাফ করতে পারেন না। যৌবন না থাকলে যা হয় তা-ই হচ্ছে। এজন্য আটসদস্যের এই পরিবারের ভেতরকে সামলিয়ে নিতে পারে এমন একটি নারীর দরকার। এদিকে আলমেরও বিয়ের বয়স।
 
আলমের মা একদেড় বছর থেকে মনে মনে বউ মা খোঁজছেন। কিন্তু ছেলের সঙ্গে মিলিয়ে বউ মা মেলাতে পারছেন না।
 
এই এলাকার প্রায় সব ঘরে বউ এনে দেন ঘটক সুনাবর। সুনাবর মোটামুটিরকম একজন মানুষ। বড় কোনো ঝামেলা না হলে মিথ্যের আশ্রয় নেন না তিনি। গরু কাটার ব্যবস্থা করে দিতে পারলেই তাকে পাঁচহাজার করে দিতে হয়। নিম্নবিত্ত পরিবার না মধ্যবিত্ত, না উচ্চবিত্ত এইসব দেখার তার সময় নেই। ইনতাজ আলী সুনাবরকে বললেন "আমার আলমের জন্য একজন কন্যা দেখিও সুনাবর। আমার ছেলে তো তোমার দেখা আছে। রাজপুত্রের মতো একপুরুষ।" "জ্বী অয় জ্বী অয় দেখমু নে, ভালা কোনো পরিবার ভালা কইনা দেখমু" বলতে বলতে সুনাবর চলে গেল। ইনতাজ আলী আলমের বাবা। গেরামের বাজারে সামান্য একটা ব্যবসা আছে। এই দোকানই আয় ব্যয়ের সব। 
 
নীলা মাহমুদের মেয়ে। মাহদুদ উকিলবারের একজন সদস্য। ছেলে মেয়েকে খেয়াল করে লেখাপড়া করিয়েছেন। মাহমুদের উকিল হিসেবে নয় মানুষ হিসেবে ভালো একটা পরিচিতি আছে। অফিস করে বাড়ি ফেরার পথে সুনাবরের সঙ্গে দেখা। সুনাবর মাহমুদকে দেখেই বলল "জনাব ভালা আছইন নি। উকিল সাব, আমি এখন আপনার বাড়িত যাওয়াত। খুব দরকার আপনার লগে। ইতা পথ মাতার বিষয় নায়। বাড়িত গিয়াউ মাতিমু। কিতা খইন।" "কিতা দরখার সুনাবর, এখন না মাতিলে অইব নানি। আমি অফিস থাকি আইয়ার। হেরান অই গেছি" বললেন উকিল মাহমুদ। "না, ইতা পথ মাতিলে কথা জাগা লয় না।বাড়িত গিয়া বইয়া দুই টুকরা মাতিমু" বলতে বলতে উকিলের সঙ্গে তার বাড়ি পৌঁছলেন সুনাবর।
 
সারাদিন কাগজের ফাইল নিয়ে দৌড়ঝাঁপ করতে করতে ক্লান্ত মাহমুদ। তবু একগ্লাস জল খেয়ে এসে বসলেন সুনাবরের কাছে। বসে সুনাবরকে জিজ্ঞেস করলেন "সুনাবর  কিতা মাতিতায় মাতিলাও।" সুনাবর ভাঙা স্বরে অস্তে অস্তে বললেন "আপনার মেয়ের লাগি ভালা শিক্ষিত একজন দামান পাইছি, গেরামর হখলেও বেটাগুরে ভালা পাইন। আমি খইয়া রাজি অইগেলে ভালাউ অইব।" সুনাবরের কথা শোনে উকিল মাহমুদ রেগে গেলেন এবং বলতে লাগলেন "ইতা মাত লইয়া আমার বাড়িত আর আইও না সুনাবর।" এইসব কথা শোনে পাক ঘর থেকে দৌড়ে এলেন মাহমুদের স্ত্রী। এসে বললেন "কিতা অইছে আমারে খও, সুনাবর লগে রাগ করিও না"।
 
 
"না কুন্তা অইছে না সুনাবর নীলার বিয়ার মাত লইয়া আইছন " বললেন মাহমুদ। এদিকে সুনাবর 'সালামাইলাইকুম' বলে উঠে দাঁড়ালেন। নীলার মা "সুবাবর ওঠ কেন আমারে খও, কার ছেলে, কিতা করে, লেখা পড়া আছে নি?" "খইলে হকলতা চিনবা, আপনারার গাউর ইনতাজ মাজনের ছেলে আলম। বাপের লগে ব্যবসা করে। বড় ভদ্রা একটা পুয়া" বসতে বসতে বলল সুনাবর। হ্যা বাচক মাথা নাড়লেন নীলার মা। আফসানা সুনাবরকে বললেন "ঠিক আছে তুমি আজ যাওগি, কাইল একবার আইও। আমি নীলার বাপরে যেলা পারি রাজি করমু।" আফসানা নীলার মা। আফসানার কথা শোনে সুনাবর চলেগেল।
 
আলমের জন্য নীলার বাড়িতে প্রস্তাব দিয়েছেন এই খবর নিয়ে সুজা চলে গেল সুনাবর ইনতাজ আলীর কাছে। ইনতাজ ও তার স্ত্রী এই খবর শোনে খুশি প্রকাশ করলেন পাঁচশত টাকা বখশিশ দিয়ে। এবং যা যা করা দরকার তা করে যেতে বললেন সুনাবরকে। 
 
পরদিন ভোরে সুনাবর চলে গেল মাহমুদ উকিলের বাড়ি। ভোরে না গেলে তাঁকে পাবে না। কারণ চাকুরে মানুষ তো। চাকুরে মানুষের অফিসের তাড়া থাকে। মাহমুদ গোসল টুসল করে প্রস্তুতি নিচ্ছেন অফিসের জন্য। গত দিনের কথা মতো দোয়ারে সুনাবর হাজির। রাতে স্বামী স্ত্রী যে পরামর্শ করেছেন তা কি সোজাচাপ্টা বলে দেবেন, নাকি সুনাবরকে দু'চারদিন ঘোরাবেন। ভাবতে ভাবতে সুনাবরকে সোজাসুজি বলে দিলেন__"আলমের বাপ নিয়া আও দু'চারদিন পরে। ইনতাজ নিয়া বই। মাতে কথা অইলে ফুড়ি দেলাইমু।" 
 
গেল ভাদ্রমাসের ১৫ তারিখ বসেছিলেন উভয় পরিবারের ২০ সদস্য। অনেক কথা হয়েছে বৈঠকে। গুরুত্ব দিয়ে সোনা আর মোহরের কথা হল। পাঁচতোলা সোনা আর চার লাখ টাকা মোহর সাব্যস্ত হল। এতে উভয় পরিবার রাজি। বিয়ের তারিখ নির্ধারণ হল চৈত্র মাসের ২৫ তারিখ। এতেও কারও দ্বিমত নেই।
 
আনন্দের শেষ নেই দ্বয় পরিবারে। কারও দামান ভালো মিলেছে আর কারও আনন্দ বউ মা ভালো পেয়েছে। যেমন পরিবার দ্বয় খুশিমুখর। ঠিক তাই হচ্ছে বর ও কন্যার মুখে। নিজেকে যতভাবে সাজালে মানায় ততভাবে প্রস্তুত করছে। কল্পনা জল্পনার ভেতর দিয়ে চৈত্রমাস উপস্থিত। চৈত্রমাসের পোড়া রোদে জমিন ফেটে যেমন জলপিপাসু তেমনি নীলা ও আলমের ভেতর একে অপরকে পাওয়ার আশায় তৃষ্ণার্ত হয়ে ওঠছে। 
 
এদিকে নীলার মা আগের সব কথা ভুলে গিয়ে লজ্জা শরমের মাথা খেয়ে তাজু'র সঙ্গে ওয়াদাবদ্ধ হয়ে গেলেন তার ছেলেকে নীলাকে দেবেন। আর ২৫ তারিখই বিয়ে হবে। সোনা ও মোহর আলমের মতো দিতে হবে বলে সিদ্ধান্ত করেন। তা শাফি'র বাবা মেনে নিলেন। নীলা ও তার বাবা এইসব জানেন না। ১৯ তারিখ সকালে চা খেতে খেতে নীলার মা উকিল মাহমুদকে সবকিছু খোলে বললেন। এতে উকিল চিন্তায় পড়ে গেলেন। বাইরে তো তারই যেতে হয়।
 
এই ঘটনা শোনে মানুষ কী বলবে! ভাবার কোনো কারণ নেই বললেন নীলা'র মা মাহমুদকে। এইসব সামাল দিতে হলে থানায় ডি জি করা দরকার। ডি জি'র কথা শোনে ক্ষেপে গেলেন মাহমুদ উকিল। এই ক্ষেপাবস্তায় বেরিয়ে গেলেন অফিসের উদ্দেশে। কিছু দূর যেতে না যেতে 'না চাইতে জলে'র' মতো সুনাবরকে পেয়ে গেলেন। বাড়িতে ঘটে যাওয়া সব ঘটনা বললেন সুনাবরকে। 
 
আরমাত্র পাঁচদিন। মানে ২৫ তারিখ মঙ্গলবার বিয়ের অনুষ্ঠান। বৃহঃবার দুপুর বেলা হঠাৎ করে সুনাবর হাজির মুখ ভার করে। বিড়বিড় কী যেন বলছে? সুনাবরের এমন মুখ আর কেউ দেখেছে কী না জানি না। কপাল কুঁচকানো দেখে ঘাবড়ে গেলেন ইনতাজ আলী। সুনাবর মঙ্গলবারের অমঙ্গলের কোনো কথা নিয়ে এলো কী না ভাবনায় পড়ে গেলেন ইনতাজ আলী তাঁর স্ত্রী। ইনতাজের ভাবনাই ফলে গেল। সুনাবর ঘরে না ওঠে বারান্দায় বসে পড়ল।
 
 
চিন্তা পড়ে গেল কী বলবে। সুনাবরকে ঘিরে বসেছে ইনতাজ ও তাঁর স্ত্রী। "কিতা হইছে সুনাবর আমরারে খও" বললেন ইনতাজ। সুনাবর একটু সাহস পেল। তবু ভাঙা ভাঙা স্বরে বলল "তোমরারে কথা দিসলাম উকিলের ফুড়ি আনিয়া দিমু, কিন্তু পারলাম না নীলার মা'র লাগি। আমারে মাফ করিয়া দিও। আমি যদি বাঁচিয়া থাকি তা অইলে কাইলকুর ভিতরে বেটি এগু আনিয়া দিমু।"
 
 
"ঠিক আছে ঠিক আছে বলে ইনতাজ সুনাবরের হাত ধরিয়া ঘরে লইয়া গেল এবং চা নাস্তা করাইয়া সামান্য টাকা হাত ধরিয়া দিলা।" কিন্তু সুনাবর লজ্জায় মাতা নত করে বললেন "আমারে আর লজ্জা দিও না।" তবু ইনতাজ টাকাগুলো পকেটে পুরে দিলেন। এখন কী করবেন। নিরবই থাকলেন। অতঃপর কন্যার খোঁজে বেরিয়ে পড়লেন সুনাবর।
 
অবশেষে নীলাময় সত্তাগুলোর আত্মা ও চোখ স্বপ্নহীন হতে হল।