Tuesday, August 20, 2019

কবি গৌতম রায় এর কাব্যগ্রন্থ “জল সিন্থেসাইজার" সম্পর্কে যা লিখলেন কবি তৈমুর খান


 তৈমুর খান


জল সিন্থেসাইজার একটি সাংকেতিক প্রবাহ 
 তৈমুর খান 

গৌতম রায় তাঁর ষষ্ঠ কবিতার বই “জল সিন্থেসাইজার”(বৈশাখ ১৪২৩) আমার হাতে তুলে দিলেন। বইটি এবছর (২০০১৮) মন্দাক্রান্তা পুরস্কারের জন্য মনোনীত হয়েছে। স্বাভাবিকভাবেই একটা কৌতূহল ছিলই। পাঠ করার পর এর বিশেষত্ব অনুধাবন করতে পারলাম। 
গৌতম রায় পুরুলিয়া জেলার কবি। এই জেলার লোকাচার, সংস্কৃতি, মানুষের জীবনযাত্রার ছবি খুব কাছ থেকে কবি দেখেছেন। সেসবই কবির লেখার বিষয়। 
 
“জল সিন্থেসাইজার” নামকরণেই কবি বিষয়টির প্রতি মনোযোগ আদায় করে নিয়েছেন। সিন্থেসাইজার বা Synthesizer শব্দটির অর্থ হল : an electronic musical instrument typically operated by a keyboard producing a wide variety of sounds by generating and combining signals of different frequencies. এই সুরমাধুর্যের সাংকেতিক প্রবাহটি কবি জনজীবনের যাপনেই শুনতে পেয়েছেন।
 
 
কবিতাগুলিতে লৌকিক জীবনচর্যার বিন্যাসে উঠে আসে ঐতিহ্যের পুনর্নির্মাণ । ভাষা ও শব্দে গতি পায় ক্রিয়াসংযোগের নিগূঢ় তাৎপর্য। দ্রষ্টা নিবিড় সংশ্লেষে যে উষ্ণীক বৃত্ত তৈরি করেন তা দেশজ নানা প্রচলিত সংস্কারে একটা অকৃত্রিম আবহাওয়া এনে দিতে সক্ষম। কালভার্টে জলের ধামসা, মাছের উজানে উলফা, পোয়াতি বউয়ের ঘোমটা তুলে বুক জলের নম্রতা — সেইসব জাগতিক সংলাপের বৃত্ত। সেখানে দেখি ডাহুকি ছুটে যাচ্ছে মৌরালা ঝাঁকের দিকে, অথবা,
 
 
জগাই মাধাই এর মাউথঅর্গান শুনি, লখাইয়ের বউয়ের পুকুরে ছড়িয়ে দেওয়া বাসনকোসন দেখি। মনসার বার এর নিয়ম কানুন জেনে নিই। তারপর ভাত-বেগুনের রান্না। গৌতম নিখুঁত জীবনচর্যার এই প্রক্রিয়ায় যে কাব্য নির্মাণের মিশ্রণ তৈরি করেন তা জীবনের পারিভাষিক আলোয় জলের সিন্থেসাইজার হয়ে বেজে গেছে। কবিতার ভাষায় দ্রবীভূত হয় স্থানিক কালিকের পরিচয় অথবা শেকড় সম্মোহন :
 
“টুনির মাগাছ তোয়ার কাছে যাঞ্চা করে 
                                               পরনের ফ্রক 
শৈশব দেয় সব          রাখে না কিছুই 
ত্যক্তফ্রকের উচ্চতায় 
                          বড়ো হয় জীবনপুর 
 
গাছমায়ের রান্নাঘরে আমারও নিঃশ্বাস প্রশ্বাস 
চমৎকার বিশ্ব              আয়ু পরমায়ু বুনন”
 
নোনাধরা ইঁট থেকে মাটি, রুলটানা তালগাছ, ঘাম, প্যারাসিটামল, অ্যান্টিবায়োটিক, গেটভাল্ব, ইমার্জেন্সি কল্, জীবনপুরের মডেল, ইঁটভাটাসভ্যতা প্রভৃতি সবই কবিতার ভাষা হয়ে যায় ।  আধুনিক সভ্যতার যাবতীয় ব্যবহার্য ইনস্ট্রুমেন্ট থেকে ঐতিহ্যের বোহেমিয়ান সংস্কারের রেখায় তুলে এনেছেন কাব্যবুননের নির্মিতি। পারফিউম থেকে বিগসপার ব্যান্ড, জাবটজল, ইউটার্ন উচাটন সবই উপস্থিত করেছেন। আর একটি অংশ উল্লেখযোগ্য :
 
“ট্র্যাকের দুপাশে ঘাসের শরীরে ধানের শরীরে 
ল্যাভেন্ডার ডিউ ঘ্রাণ 
শীত ছুঁয়ে থাকে স্নায়ুঅঞ্চল 
উদয়ন ঈশে শিরশিরানি স্নান”
 
কবিতায় এত সহজে এই মিশ্রণ একজন দক্ষ কারিগর ছাড়া সম্ভব নয়। গৌতম এসব অনায়াসেই পেরেছেন। বলেই তাঁর কাব্য অবগাহনে মুগ্ধতার অবকাশ পেলাম ।  ইঁদ পরবের রাজবংশীতে ইন্দ্রছাতার ঝুমুরের সাথে মাদলের বাজনায় মিশে গেলাম। বিচিত্র শব্দস্রোতের স্বয়ংক্রিয় স্বরলিপি নামকরণের তাথৈ বিলোল ক্রিয়ায় নিবেদিত হল গভীর সংরাগ। যেকোনও পাঠককেই বইটি ভালো লাগবে।