বাংলা ভাষার ই-ম্যাগাজিন । যে কোনো সময় লেখা পাঠানো যায় । ই-মেলে লেখা পাঠাতে হয় ।

Saturday, January 12, 2019

- শ্যামল কুমার রায়

- শ্যামল কুমার রায়


শ্রীময়ী
                                          


প্রথম পর্ব
                
                    মুরারীমোহন মেমোরিয়াল উচ্চ বিদ্যালয়ের একাদশ শ্রেণির ছাত্রী শ্রীময়ী। সহ শিক্ষা বিদ্যালয়ের দ্বাদশ শ্রেণির ছাত্র মুকেশ শর্মা । ঐ বিদ্যালয়টা মুকেশের ঠাকুরদার স্মরণে । অত্যন্ত উচ্চবিত্ত ঘরের ছেলে মুকেশ । অর্থের প্রাচুর্য মুকেশ কে বখাটে ছেলে হতে দেয়নি । কারণ, মুকেশের মা লেডি ব্রাবোন কলেজের বাংলার  অধ্যাপিকা। মা জাতিতে বাঙালি । আর বাবা মারোয়াড়ি । মাঝারি মাপের শিল্পপতি । মুকেশের মা, বাবার ও প্রেমের বিয়ে । তখন ১৯৭৪ সাল। বাঙালি মেয়ে তিতলি তালুকদার ।আশুতোষ কলেজে বাংলা অনার্সের ছাত্রী । আর মুকেশের বাবা মাখনলাল শর্মা তখন ফিটফাট তাজা যুবক । অডি গাড়িতে চড়ে কলেজে আসত । আর পুলিশ কনস্টেবল, তারকনাথ তালুকদারের মেয়ে তিতলি সাদামাটা কিন্তু মার্জিত পোষাকে কলেজে আসত। মৃদু ভাষী, শালীন, মিষ্টি মুখের তিতলি কে চোখে লেগে গেল মাখনের । হাতে সোনার আংটি ও গলায় সোনার চেন। মাখন হিসাব শাস্ত্রে অনার্স। কলেজ ক্যাম্পাসে তিতলি থেকে চোখ সরত না মাখনের । চাপা গুঞ্জন শুরু হল কলেজে - প্রজাপতি এখন আর ফুলে বসে না , রে। প্রজাপতি এখন মাখনে আটকে গেছে। সতীর্থদের উৎসাহ, টিপ্পনী তে কখন যে ওরা কাছাকাছি চলে এল, তা দুজনকেই ভেবে বলতে হবে।
   অভিজাত পরিবারের ছেলে মাখন এর পর হার্ভার্ড বিজনেস স্কুল থেকে এমবিএ করে দেশে ফেরে। আর তীব্র লড়াই করে জীবন যুদ্ধে টিকে থাকা তিতলি মাস্টার্স কমপ্লিট করে জে আর এফ কোয়ালিফাই করে। তালুকদারবাবুর অশিক্ষিত কিন্তু ধর্মপ্রাণ স্ত্রী তিতলির নৈতিক চরিত্র গঠনে খুব বড় ভূমিকা নিয়েছিলেন । একদম নিজের প্রচেষ্টাতে রিসার্চ করাকালীন তিতলি লেডি ব্রাবোন কলেজে অধ্যাপিকা পদে যোগদান করে । জীবনের প্রথম প্রেমের কথা তো ভোলা যায় না । আর মাখন , তিতলির সম্পর্কটা 'ফ্লার্ট' এর ছিল না ।

    
                       দ্বিতীয় পর্ব
                      
    মাখন ফিরে এসে তিতলি কে প্রপোজ্ করল । অধ্যাপিকা তিতলি সলজ্জ হেসে বলল, " জানি না যাও ।" কিন্তু অবাঙালী তাও আবার মারোয়াড়ি পরিবারে মাছ ভাত খাওয়া বাঙালি মেয়ে? ছি!ছি!ছি!বেটা , মাখন, ইয়ে গলত হ্যায়।
আবার মেয়ে প্রফেসর তো কি হয়েছে? বংশ বলেও তো একটা ব্যাপার আছে? একদিকে, এত বছরের জমানো কৃতজ্ঞতা, রক্ত ঋণ শোধ করার সময়ে মা বাবা কেউ বুঝল না । আর মাখন কে ছেড়ে অন্য কাউকে বিয়ে করা যায়, শরীর দেওয়া যায়, তার ঔরসজাত সন্তানের মা হওয়া যায়, কিন্তু মনের জমির দখলীসত্ব কি করে দেবে , তিতলি? ওর মনের জমির মালিক যে একমাত্র, একমাত্র মাখন । সুতরাং আর কি? এক কাপড়ে তিতলি বাড়ি থেকে বেরিয়ে সোজা মাখনের কর্পোরেট অফিসে। জ্যোতিষী শ্রী ঋষিকেশ শাস্ত্রী বলেছিলেন, " মাখনের বৃহস্পতি তুঙ্গী । " আর মাখনের ইন্টারকাস্ট ম্যারেজ হবে। আমেরিকা যাওয়ার আগে মাখন তিতলি কে নিয়ে শাস্ত্রী আঙ্কেলের কাছে  গিয়েছিল । যোটক নিঃসন্দেহে রাজযোটক। কিন্তু রান অ্যাওয়ে ম্যারেজ। পরিনতি যখন জানাই ছিল, তখন তো আর সময় নষ্ট করার কোন মানে নেই । তিতলি কে নিয়ে মাখন নিজের পাওয়া অফিসের ফ্ল্যাটে। প্রেমিক আর স্বামী কখনো এক হয় না , বিশেষ করে পুরুষতান্ত্রিক সমাজে। তিতলি তাই অধ্যাপনা সামলে স্ত্রী ধর্ম পালন করত। প্রকৃতির নিয়মে মাখন আর তিতলির কোল আলো করে এল সৌমদর্শন মুকেশ । সব অভিমান , জমানো ক্ষোভ, ব্যাথা নিমেষ উধাও হয়ে গেল নাতি হওয়ার আনন্দে। সম্পর্কটা শুধু আর তিতলি আর মাখনের মধ্যে রইল না, জোড়া লাগল দুটো পরিবারের মধ্যেও ।

             তৃতীয় অধ্যায়
            
          পৃথিবীতে সময়ই একমাত্র জিনিস যে কারোরই কথা শোনে না । মাখন আর কোনো কোম্পানির সি.ঈ.ও. নয়। সে এখন নিজেই তিতলি গ্রুপ অফ্ কোম্পানির মালিক । তাদের ভালোবাসার চিহ্ন মুকেশ এখন কোলকাতার সব থেকে দামী , ঐতিহ্যবাহী, সহ শিক্ষাযুক্ত বিদ্যালয়ের অষ্টম শ্রেণির মেধাবী ছাত্র । আর  ঐ একই সহ শিক্ষামূলক ইংরেজি মাধ্যম স্কুলের ছাত্রী শ্রীময়ী । শ্রীময়ী মাননীয় তমোনাশবাবুর একমাত্র মেয়ে । শ্রীময়ীর বাবা সরস্বতী আদর্শ বিদ্যানিকেতনের প্রধান শিক্ষক । একমাত্র মেয়ে বলে জীবনের সব সুখ , সাচ্ছন্দ উজার করে দিয়েছেন তমোনাশবাবু । পাড়ার সবাই বলে , শ্রীময়ী তো তমোনাশবাবুর শুধু রাজকন্যেই নয়, ও তো দুর্গা । বরাবরের ডানপিটে শ্রীময়ী পড়াশোনাটা ভালোই করত। তবে মায়ের ইচ্ছেয় সে ক্যারাটে ক্লাস ও করত। মুকেশের সঙ্গে সখ্যতা সেই সময় থেকেই । মুকেশ বেশ কয়েকবার শ্রীময়ীর কাছে ক্যারাটেতে পরাজিত হয়েছে । তখন কিন্তু ওদের সম্পর্কটা প্রেম ,  প্রেম ছিল না । মুকেশে আর শ্রীময়ী তখন জাস্ট নির্ভরশীল ভালো বন্ধু । একে অপরের বাড়িতে আসত, যেত । তবে মুকেশের বাবার আর্থিক অবস্থার কাছে সরস্বতী আদর্শ বিদ্যানিকেতনের প্রধান শিক্ষক তমোনাশবাবু নেহাতই টিমটিমে । তবে উচ্চ মধ্যবিত্ত পরিবারের মধ্যে গ্রহণযোগ্য তমোনাশবাবুর পরিবার। তবে সোশ্যাল এলিট বলতে যা বোঝায় , তা নিশ্চিতরূপে মুকেশের পরিবার। শান্ত স্বভাবের কিন্তু দৃঢ়চিত্ত শ্রীময়ী এসেছিল, মুকেশের বার্থডে পার্টিতে । তখন ওরা দুজনেই ক্লাস ইলেভেনে পড়ত সায়েন্স নিয়ে । মুকেশের মা লেডি ব্রাবোন কলেজের বাংলার অধ্যাপিকা তিতলি আন্টির মনে ধরেছিল শ্রীময়ী কে । এত অল্প মেকআপে যে কাউকে পরীর মত দেখতে লাগে , তাই হল শ্রীময়ী । শ্রীময়ী কে দেখে তিতলির নিজের যৌবনের কথা মনে পরে গেল । অভিজাত পরিবারের পার্টি তে অনেক নেতা, মন্ত্রী ও সমাজের প্রভাবশালী লোকজন এসেছিলেন । কিন্তু, মুকেশের মা নিজের ছায়া সঙ্গিনী হিসেবে বেছে নিয়েছিলেন শ্রীময়ী কে। এই ভালো লাগার যে খুব স্পষ্ট কারণ ছিল তাও না । তবে আর একটা খুব স্পষ্ট কারণ হল মুকেশ তমোনাশবাবুর কাছে রাজস্থানের কোটা থেকে কেনা স্টাডি মেটিরিয়াল প্র্যাকটিস করতে যেত। শ্রীময়ী কে ও দেখাতো , আর ঐ একই সঙ্গে মুকেশ কে দেখিয়ে দিতেন । অধ্যাপিকা তথা হিউম্যান রাইটস অ্যাক্টিভিস্ট তিতলি ম্যাডামের অনুরোধ ফেরাতে পারেননি , তমোনাশবাবু । মুকেশে আর শ্রীময়ী প্রায় একই টিউটরদের কাছে টিউশন পড়ত । আর শুধু ফ্রেন্ডস নয় ওরা । ওরা এখন একে অপরের বেস্ট ফ্রেন্ড । কিন্তু, জয়েন্ট এন্ট্রান্স এতে ভালো রেজাল্ট না হওয়াতে দুজনেই প্রেসিডেন্সিতে কেমিস্ট্রি অর্নাস নিয়ে ভর্তি হলো। তিন বছরের কলেজ লাইফের আনন্দ সবই পেল। বাড়িতে না বলে মুকেশের সাথে ডিস্কোতে যাওয়ার অভ্যাস হয়ে গেল শ্রীময়ীর । বাধ সাধল একদিন রাতে ডিস্কো থেকে ফেরার সময়ে । হঠাৎই ছ’জন বাইক আরোহী মুকেশের অডি গাড়ির পথ আটকালো । উদ্দেশ্য বুঝতে সময় নেয়নি শ্রীময়ী । মুকেশের হাতে হীরের আংটি, সোনার চেন, আইফোন সেভেন অবশ্যই টার্গেট, তার সাথে তণ্বী শ্রীময়ী হতে চলেছে আর একটা নির্ভয়া । ক্যারাটের ব্ল্যাক বেল্ট শ্রীময়ী বুঝে নিল দ্রুত কী করতে হবে, আর মিডিয়ার হাত থেকে রেহাই পেতে হবে কীভাবে । মদ্যপ যুবকদের রেডি হওয়ার আগেই ছ'জনের গোপনাঙ্গে ছয়টা কিক্ করল শ্রীময়ী । হালকা নেশা করেছিল মুকেশ । তবে রাজপথের ঐ অংশে সিসি টিভির নজরদারি মুক্ত । এটা মুকেশ - শ্রীময়ীর পক্ষে সৌভাগ্যের কথা । দ্রুত এলাকা ছাড়ল মুকেশ - শ্রীময়ী । পরেরদিন কাগজে কোন বাইট ছিল না । মুকেশের ইচ্ছা অনেকদিনের শ্রীময়ীর বাবা মা এর সাথে দেখা করার । রিটায়র্ড তমোনাশবাবু ও  তাঁর স্ত্রী ও চান মেয়ের পছন্দের পাত্রর সাথে একবার দেখা করার । অবাঙালী পাত্র বলে তমোনাশবাবু একটু খুঁতখুঁত করছিলেন । তবে উতরে দিলেন তমোনাশবাবুর স্ত্রী । আর তিতলি আন্টির তো ব্লু - আইড গার্ল শ্রীময়ী । এরপর মুকেশ - শ্রীময়ী ইনট্রিগেটেড পিএইচডি করতে একই আই আই টি তে ভর্তি হল। সম্পর্কটা ও গভীর থেকে গভীরতর হল। মান - অভিমান ও চলতে লাগল সমানভাবে । কিন্তু পিএইচডি - র গাইড দুজনেরই আলাদা আলাদা হল। এ যে খুব যন্ত্রণার । মুকেশের গাইড প্রফেসর দেবারতি দাশ। আর শ্রীময়ীর গাইড প্রফেসর ড ত্রিপাঠী । মুকেশে বারবার বারণ করেছিল ওনার কাছে পিএইচডি না করতে। শ্রীময়ীর এক কথা ডিস্কো থেকে ফেরার দিনটা তুই ভুলিসনি , নিশ্চয়ই । মুকেশেও বাবা মায়ের কাছের মানুষ , জ্যোতিষী ঋষিকেশ শাস্ত্রীর কাছে শ্রীময়ী কে নিয়ে গিয়েছিল । ওদের বিয়ে , প্রতিষ্ঠা বা দুই পরিবারের সম্পর্ক নিয়ে কোন সমস্যা নেই । কিন্তু, উচ্চ শিক্ষা কালে শ্রীময়ী কে একটু সাবধানে থাকতে হবে, বলে সতর্ক করে দিয়েছিলেন, জ্যোতিষী , প্রফেসর ঋষিকেশ শাস্ত্রী । হল ও তাই । ল্যাবে কাজ করতে করতে রাত হয়ে যেত প্রায় দিনই । ফাঁকা ল্যাবে প্রফেসর ড ত্রিপাঠী, পঞ্চাশোর্ধ শিক্ষক পিছন থেকে

          শেষাংশ

  ডাগর হয়ে ওঠা শ্রীময়ী কে পিছন থেকে জাপটে ধরলেন । অবিচলিত শ্রীময়ী শান্তভাবে ড ত্রিপাঠী কে বলল, স্যার ভুল করছেন । নাছোড় ত্রিপাঠী থামার পাত্র নন । স্কলার কে একবার অন্ত্যত একবার ' কাস্টিং কাউচ ' দিতেই হবে । কিন্তু, আজকের মহিষাসুরমর্দিনী , শ্রীময়ী ক্যারাটের নিয়ম ভেঙে বিল্ও দ্য বেল্ট আঘাত করল ড ত্রিপাঠী কে । এবং পরম যত্নের সঙ্গে অ্যাসিড ঢেলে চিরদিনের মতো নষ্ট করে দিল ড ত্রিপাঠীর শ্রীযন্ত্রটিকে । আর অবশিষ্ট অ্যাসিডে নষ্ট করে দিল ড ত্রিপাঠীর একটা চোখ। ঘটনাঘটনাচক্রে, সেদিন তাড়াহুড়োতে অ্যাটেনডেন্স রেজিস্টারে সহি করেনি শ্রীময়ী । পরেরদিন দিন মিডিয়া রিপোর্ট বের হল আই আই টির ল্যাবে অধ্যাপক ড ত্রিপাঠী গুরুতর আহত । শুধু অন্তর্যামী বুঝলেন, শ্রীময়ী শুধু একটা নামই নয়, তাৎপর্যপূর্ণ নাম ।
                  ------------------------------

শ্যামল কুমার রায়, সহ শিক্ষক,
নবগ্রাম ময়না পুলিন বিহারী উচ্চ বিদ্যালয়।



No comments:

Post a Comment