বাংলা ভাষার ই-ম্যাগাজিন । যে কোনো সময় লেখা পাঠানো যায় । ই-মেলে লেখা পাঠাতে হয় ।

Saturday, January 19, 2019

ব্যতিক্রমী পথ চলা // চন্দ্রনাথ চট্টোপাধ্যায়

 চন্দ্রনাথ চট্টোপাধ্যায়


আত্মবােধ-বর্জিত কৌলীন্য গৌরবের নয়। অবশ্য এর ব্যতিক্রমী ব্যক্তিত্ব বিরল নয়।
যেমন চন্দ্রনাথ বসু, রামানন্দ  চট্টোপাধ্যায়, বিবেকানন্দ মুখােপাধ্যায়,
গৌরকিশাের ঘােষ, সাগরময় ঘােষ প্রমুখ। তাদের পদাঙ্কানুসারী অনাদি রঞ্জন বিশ্বাস তার বা প্রতিমা -উজান পত্রিকার সম্পাদকীয় সংগ্রহ সাদা পৃষ্ঠা নষ্টকরি’ (সংকলন ও সম্পাদনা - অঞ্জলি দাস) গ্রন্থে সেই ব্যতিক্রমী পথ চলার পন্থা অনুসরণ করেছেন। | ‘সাদা পৃষ্ঠা নষ্ট করি’ উল্লেখ্য নামকরণের মধ্য দিয়েই বক্তব্য’র সার বিশেষ অর্থেই ইঙ্গিতবাহী। গ্রথিত সম্পাদকীয়গুলি তথ্যপূর্ণ হওয়ায় বক্তব্য বিষয়ের গুরত্ব বাড়িয়ে তুলেছে। তীক্ষ্ন পর্যবেক্ষণশক্তির সাহায্যে প্রতিপাদ্য বিষয় উপস্থাপনের মানসিকতা গ্রন্থটিতে আপােষহীনভাবে প্রস্ফুটিত।
‘বাকপ্রতিমা’ সুদূর আন্দামান থেকে প্রকাশিত হয়। স্বাভাবিক ভাবে এই গ্রন্থটিতে আঞ্চলিক সমস্যা যেমন উঠে এসেছে, তেমনি বিস্তার ঘটেছে পরিসরের। যা দূরত্ব’র ব্যবধান অতিক্রম করে নৈকট্য’র একটা সুযােগ এনে দিয়েছে।
সমসাময়িক বিষয়-ভাবনা সম্পাদকীয় নিবন্ধে যেমন এসেছে, এর সঙ্গে বাড়তি হিসেবে যা স্পর্শ করেছে তা হ’ল গুরুত্বপূর্ণ বক্তব্য, বিষয়ের সূক্ষ্ম বিশ্লেষণ। বর্তমান ও ভবিষ্যৎ পাঠককূল যার দ্বারা সমৃদ্ধ হতে পারবেন। সমসাময়িক বিষয় ভাবনার সঙ্গে সঙ্গে ভাবী প্রজন্ম’র মধ্যে একটা অতীতবােধ কার্যকরী হয়ে ওঠার ইঙ্গিত বহন করে এই গ্রন্থ।
সম্পাদকীয় নিবন্ধগুলিতে যে সব গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের অবতারণা করা হয়েছে তার দ্বারা অনেক বিতর্ক’র উপর একটা বলিষ্ঠ বক্তব্য স্থান পেয়েছে। যেমন, লিটল ম্যাগাজিন বনাম প্রতিষ্ঠান’প্রথাগত চিন্তার বাইরে এসে প্রতিপাদ্য বিষয়কে আরও স্পষ্টকরে তুলেছে।
‘অন্নপূর্ণা তুমি.. অন্নরিক্তা’একটি বিশেষ ভাবনার প্রতিফলন, যা রাজনৈতিক ব্যক্তির চিন্তা-ভাবনার ক্ষেত্রে নতুন দিশার সন্ধান দিতে পারে। বিভিন্ন নিবন্ধ যেমন, সর্ষের মধ্যে ভূতের প্রপিতামহ’, ‘পরচর্চা মহাপাপ’, ‘সৃজনশীলতা ও আত্মতৃপ্তি’, ‘সবাই ভাঙনে প্রত্যেকটিতেই একই যােগসূত্র’র মধ্য দিয়ে সাবলীল করে সজাগ করে তুলেছে সকল পাঠকের অবচেতন মনকে। যা আমরা জ্ঞাত হয়েও বাস্তব ক্ষেত্রে এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করি।
শব্দশ্লেষ ‘মাশরুম-সাহিত্যচর্চা’, ‘সাইবেরিয়ান সারস’ নতুন আঙ্গিকে ইঙ্গিতবহ। যথারীতি তথ্য’র উপস্থাপনা পাঠককুলকে সমৃদ্ধ করেছে। যা সচরাচর দুর্লভ। “কবিতার জন্ম দেওয়া প্রসব যন্ত্রণার চেয়ে কোনও অংশে কম যন্ত্রণাদায়ক নয়।”এই ধরণের বাক্য সৃজন আমাদের মনের গভীরে নাড়া দেয়।  নিত্য নতুন টিভি চ্যানেলের বাংলা বানান বিভ্রাটের প্রসঙ্গ উত্থাপন করে একটি গুরুত্বপূর্ণ নিবন্ধে আলােকপাত করেছেন। এই সব বানানবিভ্রাট কিভাবে দৃষ্টি-বিভ্রমের শিকার হয়। তা আমরা অবগত। ২৬ ডিসেম্বর ২০০৪-এর ভূমিকম্প ও জলেচ্ছ্বাস প্রসঙ্গে ‘হলুদ সাংবাদিকতার’ যে কয়েকটি দৃষ্টান্ত তুলে ধরেছেন তা ভিন্ন ঘটনাক্রমেও সমানভাবে প্রাসঙ্গিক। অনেক গুরুত্বপূর্ণ বিষয় যা অনেকের কাছেই অজানা ছিল, তার পুনরুত্থাপন একটি বিশেষ ভাবনার পরিচায়ক যা দায়িত্ববােধের কথা স্মরণে এনেছে। ২১শে ফেব্রুয়ারির পাশাপাশি ১৯শে মে’র প্রসঙ্গ যে সমানভাবেই প্রাসঙ্গিক তা ভাবার অবকাশ করে দিয়েছেন গ্রন্থকার।
‘ধীরে রজনী ধীরে’ নিবন্ধে সত্য উপস্থাপনে এমন দুর্লভ লেখনী সঞ্চার দৃষ্টান্তমূলক। বিতর্ক যে নেই, তা নয়। রামচন্দ্র অবাস্তব নয়তাে কী? এ নিয়ে আলােচনা হতেই পারে। | আরও একটি উল্লেখযােগ্য প্রতিবেদন হয়ে উঠেছে ব্যক্তিনামের প্রমিত প্রতিবর্ণীকরণ কি সম্ভব? ‘অগ্রসর পাঠক হওয়া ঢের বেশি গৌরবের’ – এ এক বিশেষ উপলব্ধির কথা হয়ে উঠেছে। একজন পশ্চাদ্বর্তী লেখক হওয়ার চেয়ে একজন অগ্রসর পাঠক হওয়া ঢের বেশি গৌরবের।
‘ভারত জুড়িয়া দুই জাতি আছে’ একটি উল্লেখযােগ্য প্রতিবেদন। ধর্মনিরপেক্ষতার। নামে যে কৃত্রিমতা তুলে ধরেছেন লেখক তা সর্ব অর্থেই অর্থবহ। - বাংলা বানান চিন্তা-ভাবনার ক্ষেত্রে পরিবর্তন চাই’ একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের উপমা আলােকপাত করতে চেয়েছেন। | বাংলা ভাষার শব্দভাণ্ডার ...পৈতৃক সম্পত্তি ? ’নিবন্ধে প্রাতিষ্ঠানিক কাগজের ভূমিকায় স্তম্ভিত হয়েছি। যদিও আমরা তাদের নিজস্ব কিছু অদ্ভুত বানান সম্পর্কে অবাহত।
’মুদ্রা-দূষণমুদ্রাদোষ !’, ‘অসিতবরণী মুদ্রা সাজে নানা সাজে’ অনেক গুরুত্বপূর্ণ দেশ সমস্যাকে সামনে এনেছেন যা প্রায়শ আমরা বিভিন্ন সংবাদপত্রের চিঠি-পত্র  কলমে প্রতিফলিত হতে দেখি। ‘স্বচ্ছ ভারত অভিযান’নিবন্ধে তথ্যপূর্ণ, অতি-গুরুত্বপূর্ণ উপলব্ধির কথা স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন। সম্পাদকীয় নিবন্ধ’র ধারাবাহিকতায় আন্দামানের দৈনন্দিন প্রসঙ্গ  সামনে আনার চেষ্টা করেছেন গ্রন্থকার , যা আমাদের অগোচরেই ছিল । বিভিন্ন ভাবে বাংলা সাহিত্য ও বর্তমান জীবনযাত্রার মানচিত্র নির্মাণে তিনি দক্ষ কারিগর হিসেবে উত্তীর্ণ বলা যায় । এমন অনেক প্রশ্ন’র তিনি জন্ম দিয়েছেন যা আমরা পরস্পর নিজেদের মধ্যে আনলেও সঠিক স্থানে তা উপস্থাপন করার সাহস ও ধৈর্য্য কোনোটাই দেখাই না । সম্পাদক সে দায়িত্ব নির্ভিকভাবে পালন করেছেন । এই জন্য তিনি আমাদের সকলের ধন্যবাদার্হ ।

বাক্প্রতিমা সাহিত্য পত্রিকা থেকে সংগৃহীত

No comments:

Post a Comment