Saturday, January 12, 2019

লেখক সমরজিৎ চক্রবর্তী


লেখক  সমরজিৎ চক্রবর্তী

অপরাজিতা
- ও মা, সে কী কথা! নতুন বউ, এখনও অষ্টমঙ্গলা হয়নি! বলেই গালে হাত দিয়ে বসে পড়লেন সুচরিতা। তারপর বাড়ি মাথায় করে তুললেন – খােকা, খােকা, কোথায় গেলি! একবার শােন তাের বউয়ের কথা !
মা’র গলা পেয়ে দীপক দোতলা থেকে সাত-তাড়াতাড়ি করে নেমে হাজির হ’ল ডাইনিং হলে। তাকে দেখেই আবার গলা তুললেন সুচরিতা- দ্যাখ তাের বউয়ের কাণ্ড! এখনও বিয়ের গন্ধ বাসি হয়নি, বলে কি না সিঁদূর পরব না! এ কী অলক্ষুণে কথা, মা! বলি, স্বামীর কল্যাণ অকল্যাণ বলে কিছু আছে, না কি?
পাশের ঘরে বসে টিভিতে ক্রিকেট খেলা দেখছিলেন নিখিলেশ। চিৎকার চেঁচামেচি কিছু একটা হচ্ছে শুনে তিনিও এসে উপস্থিত হলেন। তাঁকে দেখে আরও খানিকটা জোর পেলেন | সুচরিতা। বললেন - তােমার নতুন বউয়ের কাণ্ডটা দ্যাখাে একবার। তখনি পইপই করে বলেছিলাম, ওগাে, এ বিয়েতে মত দিও না। তা আমার কথা কে শােনে !
বিরক্ত হয়ে নিখিলেশ বললেন - আহা, আসল কথাটা কী, সেটা বলবে তাে !
  • - আসল-নকল আবার কি! নতুন বউ, বলে কিনা সিঁদূর পরবে না। বিয়ের অনুষ্ঠানে | যা পরেছি, পরেছি। বাবা রে বাবা, আমার বাপের জন্মে এমন কথা শুনিনি।
- আঃ মা, তুমি থামবে ! বলেই দীপক সােজা চলে গেল নিজের ঘরে । অপরাজিতাও  উঠে গেল তার পিছু পিছু। ঘরে ঢুকতেই দীপক দরজাটা বন্ধ করে দিয়ে অত্যন্ত মােলায়েম স্বরে  বলল - এখনই কি এসব না করলে চলছিল না ? কটা দিন পরে না হয় ...।
- তুমি তাে জানাে, যে জিনিসে মন থেকে সাড়া পাওয়া যায় না, তা’করে কোনও লাভ নেই। আমি সিঁদূর পরলেই তুমি ভালাে থাকবে, আর না পরলেই তােমার অকল্যাণ হবে .... |
- ঠিক আছে, ঠিক আছে। আপাতত একটু মাথায় চুঁইয়ে নাও। তারপর আমি দেখছি কী করা যায় ..
- না দীপক, তা হয় না।
- কেন হয় না ? তুমি কি চাও দুপুরবেলা সবাই অনাহারে থাকুক। বাবাও তােমার জন্য বসে আছে না-খেয়ে।
- প্লিজ, আমাকে ইমােশনালি এক্সপ্লয়েট কোরাে না। - বেশ, যা ভালাে বােঝে, তাই কর। বলেই দীপক চলে এল ডাইনিং হলে।
বেশ কিছুক্ষণ পর এল অপরাজিতা। নিখিলেশ তাকালেন বউমার দিকে। ছেলে | আড় চোখে তাকাল বাবার দিকে। বউমার দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে নিখিলেশ তাকালেন স্ত্রীর দিকে। সুচরিতা মুখ গােমড়া করে পরিবেশন করছেন। তখনি ঝড় উঠল না বটে, কিন্তু আজ না হয় কাল তাে উঠবেই। নিখিলেশ-সুচরিতার একমাত্র সন্তান দীপক - ছােটবেলা থেকেই বড় আদরে মানুষ হয়েছে। পারবে কি এ ঝড় সামাল দিতে ! চিন্তায় পড়লেন নিখিলেশ ।
- কী হ’ল খাবার মুখে না-তুলে বসে আছ কেন?
সচরিতার ধমকে চমক ভাঙল নিখিলেশের। বললেন - হ্যাঁ, এই তাে খাচ্ছি। পাতে হাত দিতে গিয়ে চোখ পড়ল অপরাজিতার থালায় । একটা দানাও মুখে তুলছে না মেয়েটা । ইশারায় সেটা দেখালেন সুচরিতাকে। সুচরিতা বললেন - কী হ’ল বউমা, তুমিও
- এই তাে খাচ্ছি। বলে, আঙুলে করে দুটো ভাত মুখে দিয়ে বলল - বেলা তাে অনেক হয়েছে, আপনিও বসে পড়ুন না মা।
‍সুচরিতা যেন এ কথারই অপেক্ষায় ছিলেন। বললেন - তোমরা সবাই খেয়ে নাও, তারপর আমি বসব।
-না, না, তা' কেন ? আপনি বসুন । নিখিলেশ খুশি হলেন । আজকের মতাে মেঘটা কাটল বােধহয়।
ইতিমধ্যে দীপকের খাওয়া হয়ে গিয়েছিল; সে উঠে গেল নিঃশব্দে। তার উঠে যাওয়ার মধ্যে নিখিলেশ আকাশের ঈশান কোণের একটা রঙ দেখতে পেলেন যেন। একটু পরেই উঠল অপরাজিতা। নিখিলেশ এবার যেন পরিষ্কার দেখতে পেলেন কালবৈশাখীকে। সুচরিতা কিছু বলতে যাচ্ছিলেন অপরাজিতাকে, ইশারায় নিখিলেশ তাঁকে থামালেন।
( কিছুক্ষণ পর )
নিজেদের ঘরে এসে অপরাজিতা দেখল, পাশ ফিরে শুয়ে আছে দীপক। সে-ও কোনও কথা না-বলে, অন্য দিকে ফিরে শুয়ে পড়ল। শেষমেশ হার মানল দীপক। কতক্ষণ আর মটকা মেরে শুয়ে থাকা যায় ! থেকে থেকেই এপাশ-ওপাশ করতে লাগল। তাতে কোনও সাড়া মিলল না দেখে একসময় অপরাজিতাকে কাছে টানতে গেল। প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই দীপকের হাতটা ঝটকা মেরে সরিয়ে ফোঁস করে উঠল অপরাজিতা - খবরদার, হাত দেবে না আমার গা’য়।
দীপক দমল না, বরং আরও উৎসাহ নিয়ে এগিয়ে গেল - একশ’ বার গা’য় হাত দেব, কেননা এটা আমার সাংবিধানিক অধিকার। অনেক কষ্টে গেঁথেছি, বাবা।
- ছিঃ, কী অসভ্য’র মতাে কথা ! সরো, গা’য় হাত দেবে না।
- অমন কোরাে না, এদিকে ফেরাে, প্লিজ ...
- না, ফিরব না। মনে নেই, বিয়ের আগে কী বলেছিলে ?
- আছে, সব মনে আছে। আরে, তার জন্য তাে একটু সময় দরকার। আমাদের বিয়ে হয়েছে মাত্র সাড়ে পাঁচ দিন। এদিকে এসাে, প্লিজ।
- আসতে পারি, এক শর্তে। গা’য় হাত দিতে পারবে না।
- যাঃ শ্লা, নিজের বিয়ে করা বউ বলে কি না গা’য় হাত দেবে না। শােনো, আমার বদলে ওই সূর্যদেব এসে তােমার গা’য় হাত দেবে আর একটা কর্ণ’র জন্ম হবে, ও পাঠশালায় আমি পড়ি না বাবা। এই বলে সে জোর করে কাছে টেনে নিল অপরাজিতাকে।
| দীপকের বুকে মুখ গুঁজে দিয়ে অপরাজিতা বলল – তুমি ভালাে করেই জাননা, এইসব মান্ধাতা-আমলের সামাজিক রীতিতে আমার বিশ্বাস নেই। আর যাতে বিশ্বাস নেই, মন থেকে যাতে সায় পাওয়া যায় না , তা আঁকড়ে থাকার কোনও মানে হয় না। শাঁখা-সিঁদূর পরলেই তুমি তবে নাহলে নয় - এসব ভিত্তিহীন বিশ্বাসের পক্ষে কোনও যুক্তি আছে ?
-কোনও যুক্তি নেই ঠিকই, তবে হাজার বছর ধরে যে সংস্কার আমরা বয়ে চলেছি, তা টানে তাে তুমি দূর করতে পারবে না। এর জন্য অনেকটা সময় দরকার। আর, শুধু শাঁখা সিঁদূর না পরেই কি তুমি বিপ্লবী বা সমাজ-সংস্কারক বলে নিজেকে দাবি করতে পার ?
- প্রশ্নটা নিজেকে বিপ্লবী বলে দাবি করার নয়, দীপক। কিন্তু কাউকে না কাউকে, কখনও না কখনও তাে সংস্কারের কাজ শুরু করতে হয়। সেটা না হয় আমাকে দিয়েই হােক। আর বাকি রইল সংস্কারের কথা। একটা প্রশ্নর জবাব দিতে পার, দীপক ? যখন কল্পনা চাওলা  ‍সুনীতা উইলিয়াম পুরুষের কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে পাড়ি জমাচ্ছে মহাশূন্যে, সেই যুগের একজন নারী আমি শাখা-সিঁদূর ধারণ করে সমাজে জানান দেব যে আমি বিবাহিতা ! আর তুমি ? তােমার জন্য বিবাহিত পরিচয় জানান দেওয়ার কোনও প্রথা নেই কেন? কেন থাকবে না ?
- আরে, মেয়েদের জন্য ওই প্রথাটা একটা নিরাপত্তাও বটে।
- নিরাপত্তা না ঘেঁচু। আসল কথাটা বল যে নারীকে শাঁখা-সিঁদূর বিভূষিতা করে নির্দিষ্ট করে দেওয়া হচ্ছে - তুমি মাত্র একটা পুরুষের সম্পত্তি। আর, পুরুষ চাইলে এরকম দু’দশটা সম্পত্তি রাখতে পারে, তাই তার জন্য কোনও চিহ্নধারণের বিধান নেই।
- মােটেও তা নয়। নিরাপত্তা ছাড়াও, শাঁখা-সিঁদূর হ’ল নারীর নান্দনিক সৌন্দর্যর এক শাশ্বত আবেদন। আসলে, তুমি হয়তাে কোনদিন ভেবেও দ্যাখোনি যে এই প্রথা সমাজে চালু হ’ল কীভাবে। আমার কাছ থেকে শােন সেটা, ভবিষ্যতে তােমার ‘বিপ্লব’-এর কাজে লাগতেও পারে। মহাভারতের আদি পর্বে আছে - ঋষি উদ্দালকপুত্র শ্বেতকেতু আমাদের দেশে ‘একটি নারীর জন্য একটি পুরুষ’-প্রথা চালু করেন; বৃহত্তর অর্থে যেটাকে এখন আমরা বিবাহ বলে থাকি। আবার, এই ইতিহাসের পিছনেও একটা ইতিহাস আছে। একদিন কুটিরে বসে বাবা-মার সঙ্গে গল্প করছিলেন শ্বেতকেতু। বলা নেই কওয়া নেই, এমন সময় এক ব্রাহ্মণ এসে শ্বেতকেতু’র মা'র সঙ্গে ‘বিহার’ করার ইচ্ছা প্রকাশ করলেন ও তাকে পাশের ঘরে নিয়ে গেলেন। জন্মদাত্রী মা’কে পরপুরুষের রমণসঙ্গিনী হতে দেখে শ্বেতকেতু ক্ষিপ্ত হয়ে উঠলেন। ঋষি উদ্দালক তাঁকে বােঝাতে লাগলেন এই বলে যে স্ত্রীলােক গাভীর মতােই স্বাধীন। সহস্র পুরুষে আসক্ত হলেও তার অধর্ম হয় না। কিন্তু রুষ্ট শ্বেতকেতু তা মানতে চাইলেন না। তাই, এই ঘৃণ্য সামাজিক প্রথা রােধ করতে পরবর্তীকালে ‘বিবাহ' নামক এক নারীর জন্য এক পুরুষ’-এর লাইসেন্স চালু করলেন তিনি।
- মাচ ইন্টারেস্টিং ! আরও কিছু বলার আছে তােমার ? খানিকটা শ্লেষের সুরে প্রশ্ন করল অপরাজিতা।
- অনেক কিছুই আছে। যেমন, আর্যসভ্যতার গােড়ার দিকের কথা যদি ধরাে, তখন দলবদ্ধ হয়ে যাযাবরের জীবন যাপন করত মানুষ। তাদের মধ্যে প্রায়ই পশুসম্পদ ও নারী দখল নিয়ে লড়াই হ’ত। যে দল জিতত, তারা অপর দলের পশুসম্পদ ও নারীদের লুটে নিয়ে আসত। শুধু তাই নয়, বিজিত দলের নিহত পুরুষদের রক্তে নারীদের সীমন্তে জয়টীকা এঁকে এবং হাতে লােহার বেড়ি পরিয়ে দিয়ে তাদের নিজেদের অধিকারে আনত। সেই প্রথা ক্রমান্বয়ে বিবর্তিত হতে হতে আজ ‘শাঁখা-সিঁদূর পরানাে’-য় রূপান্তরিত হয়েছে।
-তাহলে তুমি নিজেই বলছ যে একদিন পুরুষের কাছে যা ছিল অধিকারের প্রতীকচিহ্ন এবং নারীর পরাধীনতার কলঙ্কময় জয়টীকা, কালের আবর্তনে পুরুষশাসিত সমাজ তাকে নাম দিয়েছে সৌভাগ্য’র প্রতীক, তাই তাে!
- ওভাবে বলছ কেন ? ওই যে মােটা মােটা দুটো বই দেখতে পাচ্ছ - হরিচরণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের 'বঙ্গীয় শব্দকোষ', ওতেই আছে সিঁদূর-এর একটি প্রতিশব্দ সৌভাগ্যের প্রতীক।
- তা তাে থাকবেই, হরিচরণ বন্দ্যোপাধ্যায় লিখেছেন যে। শব্দকোষটি যদি কোনও বিদূষী হরিদাসী বন্দ্যোপাধ্যায় লিখতেন, তাহলে হয়তাে অন্যভাবে লেখা হত প্রতিশব্দটা।
-সত্যি, তােমার মাথায় যে বিপ্লব’-এর ভূত বেশ জাঁকিয়ে বসেছে, তাকে তাড়ায় কার বাপের সাধ্যি ! যাকগে ওসব, আরও কয়েকটি কথা বলি, শােন। বিয়ের আগের দিন কনের মা মেয়ের হাতে শাঁখা পরিয়ে দেন, যা শুভ্রতার প্রতীক। এয়ােতি’র চিহ্ন হিসেবে শঙ্খনির্মিত বলয় পরিয়ে দিয়ে মা কন্যাকে হয়তাে এই পুর্বাভাষটি দেওয়ার চেষ্টা করেন যে, জীবনের যে জটিল অংশে তুমি কাল থেকে প্রবেশ করতে যাচ্ছ, সেটি ‘শাখের করাত’ - যেতেও কাটে আসতেও কাটে। সুতরাং সাবধান থেকো, মা। পান থেকে চুন খসলেই কিন্তু বিপদ।
- তুমি তাে দেখছি, আমার চিন্তাভাবনাকেই উগরে দিচ্ছ। নতুন কোনও ‘বাণী শােনাও, যা তােমাদের পুরুষশাসিত সমাজের পক্ষে যায়।
- যা বলছি, শােন। কাজে লাগবে তােমার। সিঁদূর প্রসঙ্গে বলব - সিঁদূর হ'ল নবােদিত সূর্যর প্রতীক, যাকে উর্বরতা ও শক্তির দেবতা বলে মানা হয়। মাথার দু'পাশে ভাগ করা কালােচুলের মধ্যে সিথিভরা সিদূর কুমারী কন্যার ক্ষতযােনি’র প্রতীক বলে সবাই। আমার মনে হয়, বর কনের সিথিতে যে লাল সিঁদূর পরিয়ে দেয়, তার প্রচ্ছন্ন উদ্দেশ্য হ'ল কন্যার শরীরে সূর্যর তেজ বা শক্তি প্রবেশ করিয়ে দেওয়া। হরিচরণ বন্দ্যোপাধ্যায় লিখছেন - কাশীখণ্ডের চতুর্থ অধ্যায়ে আছে, সধবার সিঁদূরধারণে পতির আয়ুবৃদ্ধি হয়। শুনলে খুশি হবে, আমি কিন্তু তা মানি না। আমার বিশ্বাস, যেদিন এই পৃথিবীর আলাে আমি দেখেছি, সেদিনই ধার্য হয়ে গেছে আমার আয়ু - তােমার শাঁখা-সিঁদূর যার কোনও ক্ষতিবৃদ্ধি ঘটাতে পারবে না। এই শাখাসিদূরের সঙ্গে বিজ্ঞানের যেমন কোনও সখ্যতা নেই, তেমনি শত্রুতাও বােধহয় নেই। আমার
বউ হয়ে তুমি শাঁখা-সিঁদূর পরবে কি না, সেটা তােমার ব্যাপার। তবে, একান্তই যদি বিপ্লবী হতে চাও, তার জন্য একটু সময় দরকার যে !
| অপরাজিতার চাঁপাফুলের মতাে আঙুলগুলাে এতক্ষণ দীপকের বুকে খেলা করছিল। সেটা থামিয়ে প্রশ্ন করল অপরাজিতা - সেই সময়টা কতদিন ?
- তােমার মতাে অনেকে মেয়েই মনে করে, 'কুমারীত্বর অবসান হয়েছে, একথা জানানাের জন্যই শুধু নারীদের ক্ষেত্রে বিধান দেওয়া হয়েছে শাঁখা-সিঁদূর পরতে হবে। এ ভাবশ কিন্তু চাপল্য ছাড়া আর কিছু নয়। তবে হ্যা, তুমি যদি সত্যিই অন্তর থেকে মনে করাে যে ব্যবহারের কোনও গুরুত্ব নেই, সে কথা স্বতন্ত্র। স্ব-স্ব ক্ষেত্রে প্রাতঃস্মরণীয়া এমন অনেক আছেন যারা...
কাছ থেকে একটা পরিষ্কার জবাব চেয়েছিলাম। তা না দিয়ে, তুমি এখন ভাষণ দিতে শুরু করেছ । শােনাে, আমার ঘুম পেয়েছে। এখন বন্ধ করাে তােমার ওই তত্ত্বকথা। - এসাে, আমি তােমার মাথায় হাত বুলিয়ে দিই। অপরাজিতা দীপকের আরও কাছে এগিয়ে আসে। দীপক তার চুলে বিলি কাটতে বলে - তােমার বাবা-মাকে জিগ্যেস করলে জানতে পারবে, মেয়ের জন্মলগ্ন থেকেই এক প্রনা আশঙ্কায় ভুগতে থাকে প্রত্যেক বাবা-মা। তােমার এই বিপ্লব-প্রসূত হেঁদো যুক্তি তাদের কাছে গ্রাহ্যই হল কাছে গ্রাহ্যই হবে না। তাদের একটিমাত্র কামনা, তাদের মেয়েটি যেন স্বামী-সংসার নিয়ে সুখে
কে। তা’ যদি শাখা-সিঁদূরের জন্য হয়, তা-ই সই। আর এই চিন্তাভাবনা থেকে হাজার বছর পরে সমাজে যে সংস্কার গড়ে উঠেছে, তাকে কি একদিনে নস্যাৎ করা যায়, তুমি বলাে ?
কিন্তু কে বলবে ? অপরাজিতা তখন ঘুমের দেশে পাড়ি জমিয়েছে।
( তিনদিন পর )
আজ অষ্টমঙ্গলা। সকালে এসে দীপক ও অপরাজিতাকে নিয়ে গেছেন মনােমােহন। মেয়েকে নিয়ে তার যত চিন্তা। এ ক’দিন ঠিকমতাে ঘুমােতে পারেননি। সকাল হতে না হতেই ছুটে এসেছিলেন। ফোন করতে নিষেধ করেছিল অপরাজিতা।
রাত তখন আটটার আশেপাশে। শ্বশুরবাড়িতে বসে শ্বশুরের সঙ্গে গল্প করছিল দীপক। কিন্তু গল্পে মনােমােহনের মন ছিল না; থেকে থেকে আনমনা হয়ে যাচ্ছিলেন তিনি। দীপক সেটা লক্ষ্য করে বলল - আপনার কী হয়েছে, বলুন তাে? মাঝে মাঝে কোথায় যেন হারিয়ে যাচ্ছেন।
-কই না তাে ! শুনছি তাে তােমার কথা। - না, কিছু একটা হয়েছে আপনার।
- না, বলছিলাম কী, এর আগে তাে তােমার সঙ্গে তাে কখনও এক সবিস্তার কথাবার্তা হয়নি, তাই সব কিছু বলার সুযােগও ঘটেনি। আসলে, আমি যা বলতে চাইছি, তা হল - আমার মেয়েটা একটু জেদি। পারলে ওকে একটু মানিয়ে নিও, বাবা। কী বলব, যখন থেকে ও বুঝতে শিখেছে, তখন থেকেই সমাজে প্রচলিত কিছু নিয়মনীতির বিরােধিতা করা শুরু করেছে। যেমন, আমাদের বংশে কোনকালেই মেয়েদের জন্মদিন অনুষ্ঠান করে পালিত হয়নি। আমার বাপ-ঠাকুর্দার তাে ছিলই, সেই সঙ্গে আমারও বিশ্বাস যে মেয়েদের আসল জীবন শুরু হয় বিয়ের পর থেকে। কিন্তু কে শােনে সেসব যুক্তি ! অপুর বক্তব্য, 'বাপের বাড়িতে আমার জন্মদিন পালিত হবে না, আমার সুখের কথা চিন্তা করে; ঠিক আছে। কিন্তু ধরাে, বিয়ের পর যদি আমার কপাল এর চেয়ে খারাপ হয়, তখন ? আমি কি দু'তরফে কষ্ট করার জন্য জন্মেছি, না মেয়ে বলে আমার প্রতি অবিচার করছ তােমরা? বলাে তাে বাবা, এরপরেও কি কোনও বাপ তার মেয়ের জন্মদিন পালন না করে পারে ! শুধু ওর জেদের কাছে হার মেনেই এ বাড়িতে ওর জন্মদিনের অনুষ্ঠান করতে হয়েছে।
- সে তাে খুব ভালাে কথা। একদিক দিয়ে দেখলে, ওর ভাবনাটা কিন্তু যুক্তিসঙ্গত। দীপক রায় দেয়। -শুধু তাই নয়। বড় হওয়ার পর থেকে ওর এই জেদটা আরও বেড়েছে। কখনও কি
খেয়াল করে দেখেছ, পাবলিক বাসে ও কখনও মহিলা-আসনে বসে না! যাত্রীভর্তিমান সীটে পুরুষ যাত্রী বসে আছে, ও তার সামনে গিয়ে দাঁড়ালেই কিন্তু সীটটা পেতে পারে
করে ও ঠায় দাঁড়িয়ে থাকবে, জেনারেল সীট ফাকা হলে তবেই সেখানে বসবে না। ট্রেনের টিকিট কাটার সময়ও তাই, লেডিজ লাইনে দাঁড়াবে না। ট্রেনের মহিলা কামরায়। । এর জন্য কত মানুষের কাছ থেকে কত রকমের কটুক্তি যে শুনতে হয়েছে!
-এর জন্য কটুক্তি করার কোনও মানে হয় না। এটা তাে একটি মেয়ের আত্মপ্রত্যয়
- লােকে কি আর সে কথা বােঝে! যতবার আমি ওকে এসব করতে নিষেধ করে ততবারই ও জবাব দিয়েছে, বাপি, তুমি কি পদে পদেই জানিয়ে দিতে চাও যে আমি একটা মেয়ে, আমার চলাফেরার একটা গণ্ডি আছে ? কিন্তু কেন? ছেলেদের চেয়ে আমি কম কীসে? ওকে কাছে টেনে নিয়ে বলেছি, সেটা তুই বুঝবি তাের বিয়ে হওয়ার পর কন্যাসন্তান জন্মালে । রাত ন'টার মধ্যে মেয়ে বাড়ি না ফিরলে বাবা-মা’র মন উচাটন হয়, কিন্তু ছেলের ক্ষেত্রে সেটা হয় । কেন? ব্যবধানটা তুই নিজেই বুঝবি ছেলে ও মেয়ে দুটোরই মা হলে।
- তার উত্তরে কী বলে ও!
- বলে, 'ওসব ফালতু কথা। আজকের যুগে ছেলে মেয়ে সব সমান।' আমি বলি -] হয়তাে তাের যুক্তি ঠিক। কিন্তু সমাজ? তার নিয়মরীতির অন্ধকার চোরাস্রোতকে তাে অবহেলা করা যায় না, মা। এর জবাবে ওর বক্তব্য কী জানাে?
- কী? দীপক আগ্রহী স্বরে জানতে চায়।
-বলে “সমাজ ও তার নিয়ম-নীতি কারা তৈরি করেছে, বাপি? খোজ নিয়ে দ্যাখােগে, তাদের সকলেই পুরুষ। পুরুষই তার নিজের সুখস্বাচ্ছন্দ্য’র জন্য, স্বার্থ চরিতার্থ করতে সামাজিক নীতির বেড়াজাল দিয়ে একসময় বেঁধেছিল মেয়েদের চলাফেরাকে। ঘরের চৌকাঠ ডিঙোনাের অধিকার ছিল না মেয়েদের, ছিল না শিক্ষা অর্জন করার অধিকারও। চিকের আড়াল দিয়ে, ঘােমটা দিয়ে, ‘হাতে রুলি, পায়ে মল দিয়ে', শাঁখা-সিঁদূর দিয়ে তাদের অষ্টপৃষ্ঠে বাঁধা হয়েছিল। এই সমাজবিধানের অন্তর্গত কৌলীন্যপ্রথায় শতাধিক বিয়ে করার অধিকার ছিল পুরুষের। কিন্তু অশীতিপর স্বামী চিতায় উঠলে যােড়শী বধূর বেঁচে থাকার অধিকারটুকুও তারা রাখত না। কারা ? তথাকথিত সেই সমাজ-ই। কিন্তু বাপি, সে তাে মান্ধাতার পিতৃ-আমলের কথা। আজ এই একবিংশ শতাব্দীতে বসেও কি তুমি চাও, মেয়েরা মুখ বুজে মেনে নেবে সেসব রীতিনীতি, বিধিনিষেধ - যখন ইন্দিরা গান্ধী-প্রতিভা পাটিলরা দেশের কর্ণধার হচ্ছেন, কল্পনা-সুনীতারা পাড়ি দিচ্ছেন মহাশূন্যে?”
| কিছুক্ষণের জন্য থামলেন মনােমােহন। তারপর বললেন - এবার তুমিই বলাে বাবা, এই মেয়েকে বােঝাবে, কার বাপের সাধ্যি! এই তাে বিয়ের আগের দিন একবাড়ি লােকের সামনে সে কী ঝামেলা, শাখা কিছুতেই পরবে না। বলে, ‘শাখা পরা মানে বেড়ি পরা।' অনেক কষ্টে, প্রায় হাত-পা’য় ধরে ক’দিনের জন্য পরতে রাজি করিয়েছিলাম। ভাগ্যি ভালাে, এখনও তা হাতে রেখেছে দেখছি।
দীপক উত্তর দিল শুধু এক চিলতে মলিন হাসি হেসে। আর মনে মনে বলল - শ্বশুরমশাই, আপনি বেশ বুদ্ধি করেই বলটা ঠেলে দিয়েছেন আমার কোর্টে।
অষ্টমঙ্গলা সেরে বাড়িতে ফিরে দীপক বাবা-মাকে নিয়ে একান্ত আলােচনায় বসল। বােঝানাের চেষ্ট করল, থাক না অপরাজিতা তার মতাে করে। কী-ই বা হবে শাঁখা-সিদূর না পরলে! একমাত্র সামাজিক সংস্কার ছাড়া এগুলাের তাে কোনও অতিরিক্ত গুরুত্ব নেই। তাছাড়া, আমি যখন ব্যাপারটা মেনে নিতে চাইছি, তাহলে তােমাদের তাতে আপত্তি না থাকাটাই উচিত।
| নিখিলিশ নীরব হয়ে ছেলের কথাগুলাে শুনছিলেন। সুচরিতা কিন্তু ভিতর-ভিতর ফুসছিলেন। দীপক একটু থামতেই বিস্ফোরণ ঘটালেন তিনি।
-বাঃ চমৎকার ! এই তাে উপযুক্ত ছেলের কথা, বউয়ের অন্যায্য আব্দার মেনে নাও। আর আমি যে তােকে দশমাস পেটে ধরেছি, আমার কথার কোনও মূল্য নেই, তাই তাে ! আসলে, দোষ তাের নয়, যত নষ্টের গােড়া এই লােকটা। তখনই আমি পইপই করে বলেছিলাম - ওগাে, এ বিয়েতে তুমি মত দিও না। ওরা নিজেদের পছন্দমতাে যা করছে করুক। তা কে শশানে কার কথা! এবার নাও, ঠ্যালা সামলাও। গরিবের কথা বাসি হলে কাজে লাগে। বাবা রে বাবা, সারাজীবন নিজের সুখদুঃখ বিসর্জন দিয়ে যে ছেলে মানুষ করেছি আজ তার মঙ্গল-অমঙ্গলের কথা আমি চিন্তা করতে পারব না, করবে পরের বাড়ির মেয়ে !
- মা, এ যুগে এখন এটাই দস্তুর। বিয়ের পর মেয়েরাই প্রাধান্য পায় স্বামীর মঙ্গলঅমঙ্গল চিন্তা করার। আইনও এখন তাই বলে। তুমি যদি এখন আমার জন্য একটু বেশি চিন্তা করে ফ্যালাে আর তাতে যদি পরের মেয়ে কষ্ট পায়, তাহলে কিন্তু আইনের চোখে সেটা বধূ নির্যাতন হয়ে যাবে। সেইজন্য বলছি, এখন একটু চুপ করে থাকো। ওকে ওর মতাে থাকতে দাও। তাতে ওর শান্তি, আমারও শান্তি আর সামগ্রিকভাবে দেখতে গেলে, সংসারেরও শান্তি।
- বাঃ রে বাঃ! বলেই সুচরিতা পাগলের মতাে অদ্ভুত অঙ্গভঙ্গি করে হেসে উঠল।
নিখিলেশ এতক্ষণ নীরব ছিলেন। এবার তিনি সুচরিতার দিকে তাকিয়ে বললেন - তুমি কি তােমার পাগলামিটা থামাবে ?| -হ্যা আমি পাগল, পাগলই তাে! ওই শয়তানের বাচ্চা দু'দিনেই আমার মাথাটা চুষে খেয়েছে। বলেই সুচরিতা টেবিলের উপর তার মাথা ঠুকতে লাগলেন।
তাঁর এই আচমকা ব্যবহারের জন্য কেউ প্রস্তুত ছিল না। দীপক সুচরিতাকে ধরতে গেল। নিখিলেশ তাকে থামিয়ে বললেন - তুই উপরে যা। এদিকটা আমি সামলাচ্ছি।
( বছর তিনেক পর )।
ভাের পাঁচটার কাছাকাছি সময়। একটা ট্যাক্সি ছুটে চলেছে শ্রীমােহন লেন-স্থিত মাতৃসদনের প্রসূতি বিভাগকে লক্ষ্য করে। রাত প্রায় দুটো থেকে প্রসবযন্ত্রণায় কষ্ট পাচ্ছিল অপরাজিতা; এখন সে প্রায় নেতিয়ে পড়েছে। তার মাথাটা কাঁধে রেখে ট্যাক্সির পিছনের সীটে বসে আছে দীপক। ডা. মণ্ডল বারবার বলে দিয়েছেন, ওকে যেন শােয়ানােনা হয়। মাতৃসদনের কাছাকাছি পৌছতেই অপরাজিতার চেতনা যেন একটু সবল হ’ল। জানালার বাইরের দিকে তাকিয়ে সে বলল - এসে গেছি, তাই না?
-হ্যা, নিজেকে একটু শক্ত করাে। - শােন না। জড়ানাে কণ্ঠে অপরাজিতা বলে - তােমার কী মনে হয়, মেয়েই হবে ? - এখন ওসব চিন্তা থাক। যা হবে, তা হবে। - না গাে, আমার মনে হচ্ছে ছেলেই হবে।
- আচ্ছা ঠিক আছে, যা হওয়ার ঠিক তাই হবে। এখন আস্তে আস্তে সাবধানে নামাে। ধরাে দেখি, আমার হাতটা ধরাে। মাথাটা নিচু করে ...
| (সেদিনই; সকাল নটা )
মাতৃসদনের বাইরের চা-দোকানে দাঁড়িয়ে, উদ্বিগ্ন চিত্তে সিগারেট টানছিল দীপক। এমন সময় সেবিকা হাঁক পাড়ল - অপরাজিতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের পরিবারের কেউ আছেন?
হাতের সিগারেট ফেলে দিয়ে দীপক এগিয়ে গেল। সেবিকা তাকে জিগ্যেস করল - আপনি? দীপক জবাব দিল - আমি দীপক বসু। অপরাজিতা’র হাজব্যান্ড।
নার্স যেন আকাশ থেকে পড়ে। ভ্রু কুঁচকে প্রশ্ন করে -দীপক বসু কী করে অপরাজিতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের হাজব্যান্ড হয় ?
-বিয়ের পর আমার স্ত্রী তাঁর পদবি বদলাননি। যতটা সম্ভব সংক্ষেপে এই আমড়াগাছি | শেষ করতে চায় দীপক।
কিছু একটা আন্দাজ করে নিয়ে ঘাড় নাড়ে সেবিকা। অস্ফুটে বলে - এবার বুঝতে পেরেছি, হাতে শাখা কপালে সিঁদূর না থাকার রহস্য। তারপর গলা তুলে বলে – আরে মশাই, আপনার ছেলে হয়েছে। আমাদের মিষ্টি খাওয়াবেন না?
| কোনও অতিরিক্ত উচ্ছ্বাস বা ভাবান্তর দেখা গেল নাদীপকের আচরণে। পকেট থেকে পার্স বার করে যা তার হাতে উঠল, দিয়ে দিল সেবিকাটির হাতে। কিছুক্ষণের মধ্যেই নিখিলেশ ও সুচরিতা এলেন। গেটের মুখে দীপককে দেখে ছুটে এলেন সুচরিতা - কী হয়েছে খােকা?
মা'র মুখের দিকে তাকিয়ে পূর্ববৎ উচ্ছ্বাসহীন, নির্লিপ্ত গলায় দীপক বলল - ছেলে। -কী বললি? আর একবার বল ! উচ্ছ্বাসে যেন ফেটে পড়ছেন সুচরিতা। - বললাম তাে, ছেলে। খানিকটা ঝাঁঝ মেশানাে দীপকের স্বরে।
- ছেলে তাে অমন করে বলছিস কেন? তারপর নিখিলেশের দিকে তাকিয়ে সুচরিতা বললেন - দ্যাখাে, বলেছিলাম না, ভগবান আছেন। তােমার বংশ রক্ষা করার কর্তা এসে গেছে। চলাে, মহারাজকে একবার দেখে আসি দু’জনা মিলে।
দীপক বলে - এখন দেখা যাবে না। আর সেই বিকেল তিনটেয়, ভিজিটিং আওয়ার্সে। - কিন্তু ছেলে যদি এর মধ্যে বদলাবদলি করে ফেলে? আশঙ্কাজড়িত স্বর সুচরিতার।
- ও মা, তােমাকে নিয়ে আর পারা গেল না। এটা রামকৃষ্ণ মিশন পরিচালিত মাতৃসদন। তুমি নিশ্চিন্ত থাকো।
( বছর আড়াই পর )
নাতির নাম সংগ্রাম; নামটা রেখেছিলেন সুচরিতাই। আগামীকাল সে স্কুলে ভর্তি | অপরাজিতা ঝালিয়ে নিচ্ছিল ছেলেকে। পাশের ঘরে দীপক খবরের কাগজ পড়ছিল। আসি কাগজ পড়া তার অভ্যেস। ছেলেকে বসিয়ে রেখে অপরাজিতা দীপকের কাছে এসে বলল -অ্যাই শুনছ !
কাগজ থেকে মুখ না তুলেই দীপক জবাব দিল -বলল, শুনছি। - আহা, চোখ তাে কাগজেই সেঁটে রেখেছ, শুনবে কীভাবে? - চোখ দিয়ে কেউ শশানে না। কান দুটো তাে খােলা আছে, যা বলার বলে ফ্যালাে। - সব সময় রসিকতা ভাল্লাগে না। বলছি যে, ভর্তির ফর্মে ছেলের পদবি ... - সংগ্রাম বসু-বন্দ্যোপাধ্যায় হবে, না সংগ্ৰাম বন্দ্যোপাধায়-বসু হবে, তাই তাে?
-না, তা ঠিক নয়। বলছিলাম কি, অ্যাপ্লিকেশন ফর্মে আমি কিন্তু সমু’র নামের সঙ্গে কোনও পদবি দিইনি।
আচমকা কেউ যেন ঠাস করে চড় বসাল দীপকের গালে। এরকমটা যে কস্মিনকালে ঘটবে, তা স্বপ্নেও ভাবেনি দীপক। বাক্যহারা হয়ে কিছুক্ষণের জন্য সে ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে রইল অপরাজিতার মুখের দিকে।
-কী হ’ল ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গেলে নাকি? কথা বলছ না যে! বলে দীপকের হাত ধরে নাড়া দিল অপরাজিতা। অপরাজিতার ধাক্কা খেয়ে সম্বিৎ ফিরে পেতেই পাগলের মতাে চিৎকার করে উঠল দীপক - ছেলেটা কি জারজ, না ডাস্টবিন থেকে কুড়িয়ে আনা ?
| এবার অবাক হওয়ার পালা অপরাজিতার। দীপকের কাছ থেকে যে এ ধরনের প্রতিক্রিয়া আসতে পারে, সে প্রত্যাশা তার ছিল না। তাই মৃদু স্বরে সে উচ্চারণ করল - এমন করে বলছ কেন তুমি ?
| আগের চিৎকারের মাত্রা ছাপিয়ে গেল দীপকের এবারের কথাগুলাে- তাে কেমন করে বলব? কী ভেবেছ কী তুমি নিজেকে, আঁ? বলেই সে পাগলের মতাে হেসে উঠল - এতদিনে পরিষ্কার হ’ল প্রগতিশীলা রমণীর কেন মেয়ের বদলে ছেলের বায়না। সব অংক ঠিকঠাক মিলে যাচ্ছে এবার। কী সুদূরপ্রসারী দৃষ্টিভঙ্গি তােমার, চমৎকার ! আর বলতে পারল না সে, হাউহাউ করে কেঁদে ফেলল।
ঘটনার আকস্মিকতায় অপরাজিতা হতভম্ব। ব্যাপারটা সামলে নিতে সে দীপকের মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে দিতে বলল – কী পাগলামি করছ, দীপক ?
| সাপের মতাে হিসহিস করে অপেক্ষাকৃত নরম অথচ শ্লেষমাখা সুরে দীপক বলল - এটা আমার পাগলামি তাই না? আর তুমি যে নিজের একটা সর্বনাশা খেয়াল চরিতার্থ করতে বেছে নিয়েছ আমার ওই একরত্তি ছেলেটাকে ? একবারও ভেবে দেখেছ, সমাজে তােমার এই খামখেয়ালিপনার কী বিরূপ প্রতিক্রিয়া পড়তে পারে ?
- ভেবেছি দীপক, অনেক ভেবেছি। কিন্তু যুদ্ধক্ষেত্রে পা দিয়ে হার স্বীকার করার দলে আমি নই। তবে, তুমি যে এমন করবে ...
- তােমার মনে এমন সর্বনাশা ভাবনা এল কী করে, সেটাই ভেবে উঠতে পারছি না আমি। সমাজের বিরুদ্ধে তােমার বিদ্রোহ শাখা-সিঁদূরের অব্যবহার বা তােমার দীর্ঘ পিতৃ-পদবি ব্যবহারের মধ্যে সীমিত রাখা পর্যন্ত ঠিক ছিল। কিন্তু আমার ছেলেকে নিয়ে ...
- ছেলেটা যেমন তােমার, তেমনি আমারও তাে বটে। সেটা তুমি কেন, তােমার সমাজও বােধহয় অস্বীকার করতে পারবে না। শােননা, আসল বিষয়টা তুমি বুঝতে চাইছ না। আমাদের সন্তান বড় হবে তার নিজের পরিচয়ে। বাবা-মা’র পদবি-গ্রন্থির মধ্যে কেন সে আটকে থাকবে? আর তাছাড়া, বাবা-মা’র নাম তাে কোথাও বর্জিত হচ্ছে না। শুধু পদবি না থাকলেই সে জারজ ... কী অদ্ভুত সমাজের নিয়ম! আমি চাই, এই পদবি-ব্যবহার প্রথাটাই মুছে দিতে।
-কী আব্দার! তাহলে কৌলীন্য' শব্দটাও বর্জন করতে হবে এবার থেকে! শােননা, আপাতত সমাজ নিয়ে মাথা না ঘামিয়ে, ছেলের ভবিষ্যত নিয়ে ভাবাে। ওর নামের সঙ্গে যদি পদবি না থাকে, যতই ডােনেশন দাও কোনও স্কুলই ওকে নেবে না।
- নেবে না মানে? এটা মগের মুলুক নাকি! আমার খুশি, আমি ছেলের নামের সঙ্গে পদবি ব্যবহার করব না। তাতে থার্ড পার্টির কেন মাথাব্যথা হতে যাবে!
- ঠিক আছে, তােমার জিদই বজায় রাখাে। আমি আর এ বিষয়ে একটা কথাও বলব । কিন্তু মনে রেখাে, পরবর্তী সমস্ত ঘটনাপ্রবাহ’র জন্য দায়ী থাকেবে তুমি।
( পরের দিন )
অপরাজিতা স্কুলে নতুন ছাত্রছাত্রী ভর্তি করানাের লাইনে দাঁড়িয়ে। প্রিন্সিপ্যালের রুমে চলছে ইন্টারভিউ। সামনে আর মাত্র দু’জন, তারপর তার পালা।
একসময় ডাক আসে। ছেলেকে সঙ্গে নিয়ে অপরাজিতা প্রিন্সিপ্যালের রুমে ঢােকে। হাত জোড় করে নমস্কার জানায়।
| প্রতি-নমস্কার জানিয়ে প্রিন্সিপ্যাল বসতে বলেন অপরাজিতাকে। বসার পর বেশ খানিকক্ষণ অস্বাভাবিকনীরবতাবিরাজ করতে থাকে ঘরটায়। অপরাজিতা বুঝতে পারে প্রিন্সিপ্যাল ও তার সহকর্মীরা একদৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে তার মুখের দিকে। তারপর একসময় নীরবতা ভেঙে প্রিন্সিপ্যালই প্রশ্ন ছুঁড়ে দেন অপরাজিতার দিকে- এটা আপনি কী করেছেন? অ্যাপ্লিকেশনে ছেলের নামটাও ঠিকঠাক লেখেননি!
- লিখেছি তাে, সংগ্রাম!
- সংগ্রাম তাে ঠিক আছে, তার ‘সারনেম’টা কে লিখবে, আমার অফিস? বিরক্তি ফুটে ওঠে প্রিন্সিপ্যালের মুখে। | - ওর কোনও ‘সারনেম বলে কিছু নেই। মানে, আমি ব্যবহার করব না, ঠিক করেছি।
-কী! উত্তেজনায় চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়ালেন প্রিন্সিপ্যাল। কী বােঝাতে চাইছেন আপনি, বলুন তাে?
| - বােঝাতে কিছুই চাইছি না। শুধু জানাতে চাইছি যে আমার ছেলের নামের সঙ্গে আমি পদবি ব্যবহার করব না। দ্যাট অল।
প্রিন্সিপ্যালের গলার উঁচু আওয়াজ শুনে আশেপাশে থাকা দু'একজন সহশিক্ষক অনুমতির তােয়াক্কা না করেই ঢুকে পড়লেন প্রিন্সিপ্যালের রুমে। তারপর সম্মিলিতভাবে শুরু হল শ্রেষমেশাননা প্রশ্নজাল। অপরাজিতার জন্ম-ঠিকুজি থেকে সংগ্রামের বাপ-পিতামহ-প্রপিতামহ পর্যন্ত অন্বেষণ। অত্যন্ত মার্জিত ও স্বরে সব প্রশ্ন’র যথাযথ উত্তর দিল অপরাজিতা।
-ইট সীম এভরিথিং ইজ ইন অর্ডার। নাউ, দ্য কোয়েশ্চেন ইজ - হােয়াই ইউ আর গােয়িং টু টেক সাচ রেভল্যুশনারি স্টেপ ? অপরাজিতার ধারটা ঠিক বুঝতে না পেরে প্রিন্সিপ্যাল একটু কায়দা করেই ইংরেজিতে প্রশ্নটা করেন।
- বিকজ ইটস অ্যা রেভল্যুশন; রেভল্যুশন এগনেষ্ট অ্যান আননেসেসারি কাস্টম অফ আওয়ার সাে-কলড সােসাইটি। তুরন্ত জবাব ভেসে এল অপর প্রান্ত থেকে।
| অপরাজিতার মুখে বিশুদ্ধ অ্যাকসেন্টের চোস্ত ইংরেজি শুনে ঘরের মধ্যে যাকে বলে ‘পিন-ড্রপ সাইলেন্স' বিরাজ করতে থাকে। এমন সময় পার্টির দাক্ষিণ্যে সদ্য জয়েন করা এক ঝান্ডাগর্বিনী শিক্ষিকা প্রশ্ন করে বসলেন - আপনার এবং আপনার হাজব্যান্ডের অ্যাকাডেমিক কোয়ালিফিকেশনটা কি আমরা জানতে পারি ?
- ওহ শিওর, হােয়াই নট! আই গেজ্ড দ্যাট সাচ সিচুয়েশন কুড অ্যারাইজ। আমি ওগুলাে সঙ্গে করেই নিয়ে এসেছি। বলেই ব্যাগ থেকে তাদের দু'জনের সার্টিফিকেটের ফাইল দুটো বার করে অপরাজিতা তুলে দেয় প্রিন্সিপ্যালের হাতে।
ফাইলের কাগজপত্র দেখে প্রিন্সিপ্যালের তাে চক্ষু ছানাবড়া। অ্যাকাডেমিক কোয়ালিফিকেশনে তার সামনে বসা ‘হবু অভিভাবিকা তাে তার চেয়েও কয়েক কাঠি উপরে ! এর আর কি ইন্টারভিউ নেবেন তিনি! বেগতিক দেখে তলব করলেন ম্যাথুস টিচার জয়ন্ত সরকারকে, যার উপর তিনি সবচেয়ে বেশি আস্থা রাখেন।
ছাত্রছাত্রীদের প্রিয় জয়ন্ত স্যার প্রিন্সিপ্যালের রুমে পা দিয়েই ভূত দেখার মতাে চমকে উঠলেন - আরে, অপু তুই!
কলেজবন্ধু জয়ন্তকে দেখে হাঁফ ছেড়ে যেন বাঁচল অপরাজিতা। তার কণ্ঠ থেকেও উৎসারিত হ’ল বিস্ময়-মাখানাে প্রশ্ন - তুই এখানে!
- বাঃ রে ! এর মধ্যেই ভুলে গেলি ! সেবার দার্জিলিং-ভ্রমণে গিয়ে তুই-আমিনন্দিনী-শ্যামাশিস শপথ নিয়েছিলাম না যে আমরা কেউ ডাক্তার ইঞ্জিনিয়ার হওয়ার পিছনে নাছুটে ‘গাধা পিটিয়ে ঘােড়া বানানাে’রব্রত গ্রহণ করব। আমি তাে সেইব্রত পালন করছি এখানে।
- দাঁড়াও, দাঁড়াও, তােমাদের আলাপ শুনে মনে হচ্ছে তােমার একে অপরকে চেনাে। জয়ন্তকে একরকম বাধা দিয়েই প্রিন্সিপ্যাল বলে উঠলেন।
জয়ন্ত জবাব দিল - চেনা মানে? আপনি জানেন, এই মহিলা তার কিশােরীবেলা থেকেই আমার কেরিয়ারের সবচেয়ে বড় শত্রু। ওর জন্য আমি জীবনে কোনদিন ক্লাশে ফাস্ট হতে পারিনি, স্যার। ওর আর একটা বৈশিষ্ট্য হ’ল - সেই ছাত্রীজীবন থেকেই ও স্রোতের বিপরীতে চলতে ভালােবাসে, সামাজিক রীতিপ্রথার কোনও তােয়াক্কা না করেই।
তারপর অপরাজিতার দিকে তাকিয়ে বলে - বেশ ক’বছর হয়ে গেল, তাের কোনও খবরাখবর জানি না। তা, তুই কি এখানে কাউকে ভর্তি করাতে এসেছিস ?
- উদ্দেশ্য তাে সেটাই ছিল। কিন্তু আমার গাধাটাকে বােধহয় তাের আর পেটানোর সুযােগ হ’ল না। কী স্যার, তাই তাে ..., বলেই প্রিন্সিপ্যালের দিকে তাকাল অপরাজিত
- আপনারা সব যার যার ক্লশে যান তাে। না, না, জয়ন্তবাবু আপনি যাবেন আপনি এখানে থাকুন।
সহশিক্ষকরা চলে যেতেই অপরাজিতার দিকে তাকিয়ে প্রিন্সিপ্যাল বললেন - সিস্টেমের বিরুদ্ধে আমি যেতে পারি না, আমার হাত-পা বাঁধা ... প্লিজ, আর একবার আপ সিদ্ধান্তটাকে বিবেচনা করুন। ...
- থ্যাঙ্ক ইউ ফুর ইওর কাইভ সাজেশন, স্যার। বাট, আই অ্যাম দ্য লাস্ট পার্সন রি-কনসিডার এনি অফ মাই ডিসিশন্স। বেটার আই কুইট। হ্যাভ এ নাইস ডে। বলেই সংগ্রামের হাত ধরে রুমের বাইরে পা বাড়াল অপরাজিতা।
| - আরে, কী হয়েছে অপু, শােন শােন। জয়ন্ত বাধা দিতে যায় অপরাজিতাকে।
কিন্তু কে শােনে কার কথা ! অপরাজিতা তখন রণরঙ্গিনী মূর্তিতে অগ্রসর হয়েছে স্কুলবিল্ডিং-এর মেনগেটের দিকে।
একের পর এক স্কুল ঘুরতে ঘুরতে হাঁফিয়ে উঠেছিল অপরাজিতা; সেই সঙ্গে দীপকও। কেননা, দায়বদ্ধতা থেকেই হােক বা স্বামীর কর্তব্যবােধ থেকে হােক, দীপকের একসময় মনে হয়েছিল অপরাজিতাকে সঙ্গ দেওয়া দরকার। তাই শেষের দিকে সেও অপরাজিতার সঙ্গে স্কুলে স্কুলে ঘুরছিল; কিন্তু কাজের কাজ কিছুই হচ্ছিল না। বরং, যেসব স্কুলে তারা যাচ্ছিল, সেখানে একটা তামাশার বাতাবরণ তৈরি হয়ে উঠছিল তাদের ঘিরে। ক্রমান্বয়ে সে খবর পৌছে গেল উভয় পক্ষ’র পৈতৃক বাড়িতে। আত্মীয়-পরিজন, বিশেষ করে শ্বশুরকুলের, সকলের কাছে অপরাজিতা হয়ে উঠল হাসি-তামাশা ও উপহাসের বিষয়বস্তু।
|স্রোতের বিপরীতে একটি সুনির্দিষ্ট নীতি নিয়ে চলা অপরাজিতা সাধারণ-রুচি মানুষের মন্তব্য বা উপহাসকে গা’য় মাখতে শেখেনি কোনদিন। কিন্তু যে চিন্তা তার মাথাটাকে অহর্নিশি কুরে কুরে খাচ্ছিল, সেটা তার ছেলের ভবিষ্যত নষ্ট হওয়া। আর এর জন্য সে দায়ী করছিল নিজেকে, ধিক্কার দিচ্ছিল নিজেকে। দিনের পর দিন এই একই চিন্তার মারণ জীবাণু একদিন গ্রাস করল অপরাজিতার স্বাস্থ্যকে। অচিরেই জ্বরে পড়ল সে। শুধু জ্বর নয়; থেকে থেকে বেহুশ হয়ে যাওয়াও। আর বেহুশ জ্বর থেকে দেখা দিল প্রলাপ।
এই পরিস্থিতিতে খানিকটা দয়াপরবশ হয়ে, খানিকটা বিবেকের তাড়নায় অপরাজিতার কাছে ছুটে এলেন তার শাশুড়ি সুচরিতা। দীপকের কোনও ওজর-আপত্তি গ্রাহ্য না-করেই তিনি নাতি-সহ সুচরিতাকে নিয়ে গেলেন বাড়িতে।
সুচরিতার সেবা-শুশ্রুষা পেয়ে মাসখানেকের মধ্যেই জ্বর সেরে গেল অপরাজিতার। কিন্তু জ্বর ছাড়লেও, অপরাজিতার মস্তিষ্কর মধ্যে রয়ে গেল তার এক সুদূরপ্রসারী প্রভাব। আপন মনেই সে অনেক কিছু বলতে থাকে, কেউ শুনুক না শুনুক।
( সপ্তাহখানেক পর )
বােজই সন্ধে সাতটার দিকে সুচরিতা এসে বসেন অপরাজিতা’র ঘরে। আজও তিনি
তির সঙ্গে খুনসুটি করছিলেন। শুনতে পান, আপনমনেই কথা বলে চলেছে অপরাজিতা। C% পান বটে, কিন্তু সেসব কথার অধিকাংশই বুঝতে পারেন না তিনি। শুধু এটুকু ধরতে
বন যে তার পুত্রবধূটির অসংলগ্ন এই সমস্ত কথা-বলা’র কেন্দ্রবিন্দু হ’ল হিন্দু শাস্ত্র’র বিধান ও বিধিনিষেধ।
অপরাজিতার বলে চলে - বৈদিক যুগে নারীরা কেন পদবি ব্যবহার করত না? কেন পাগী-মৈত্রেয়ী-গায়ত্রীরা তাদের নিজেদের নামটুকু নিয়েই পরিচিতি লাভ করেছেন? রামায়ণমহাভারতে বর্ণিত চরিত্রগুলি পদবি-বিহীন কেন ? দ্রুপদকন্যার নাম দ্রৌপদী, জনক-কন্যার নাম জানকী - এই তাে ছিল তাদের পরিচিতি ! তাহলে, এ যুগে কেন শাস্ত্র’র দোহাই দিয়ে নারীর বিবাহােত্তর পদবি-পরিবর্তন বাধ্যতামূলক করা হয়েছে ? আসলে হিন্দু শাস্ত্রগুলাে সব পরস্পরবিরােধী; আর এর বিধিবিধান নারীবিরােধী তাে বটেই।
সুচরিতা ভাবেন - সত্যিই তাে, ওইসব প্রাতঃস্মরণীয়া নারীদের তাে পদবি বলে কিছুই নেই ! কিন্তু নেই কেন, তা নিয়ে তিনি কখনও চিন্তাভাবনাও করেননি। তবে, এতদিন ধরে অপরাজিতার চালচলন-ক্রিয়াকলাপকে লক্ষ্য করে তিনি এটুকু হৃদয়ঙ্গম করেছেন যে মেয়েটা যাকরছে, তা ওর নিজের ক্ষুদ্র স্বার্থর জন্য নয় – বৃহত্তর নারীজাতির একটা দাবি আদায়ের জন্যই তার এই সামাজিক প্রথাবিরােধিতা। আর, এই ভেবেই কবে থেকে যেন নিজের অজান্তেই অপরাজিতা’র মতকে, ওর পথকে সমর্থন করে বসেছেন সুচরিতা।
| অপরাজিতা বলতে থাকে - বুঝেছেন মা, শাঁখা-সিঁদূরের মতাে এই পদবি’র ব্যবহারও এখন ত্যাগ করব। একটি শিশু তার নিজের নামটি নিয়েই বেড়ে উঠুক না! দরকার হলে, রাষ্ট্রকে এর জন্য নতুন আইন প্রণয়ন করতে হবে।...।
কথা বলতে বলতে গলা শুকিয়ে গিয়েছিল অপরাজিতার। খকখক করে কাশতে কাশতে তার চোখ দিয়ে জল বেরিয়ে এল। সুচরিতা দৌড়ে গিয়ে গ্লাশে করে জল নিয়ে এল। জলটা খেয়ে তৃপ্তির নিঃশ্বাস ছাড়ল অপরাজিতা।
| হঠাৎ করে সুচরিতার মাথায় একটা চিন্তার রেখা ঝিলিক দিয়ে উঠল। ভাবলেন – এই একটা রাস্তায়ই এক ঢিলে দুই পাখি মারা যেতে পারে। মুহূর্তমাত্র সময় নষ্ট না করে তিনি বললেন - অপু, সমাজে চলতে গেলে কারও কথা তাে আমাদের মান্য করতে হবেই। কেননা, সংগ্রামের ভবিষ্যতচিন্তা আমাদেরই করতে হবে আগে। তাই আমরা যদি এই ব্যাপারে একটা মামলা দায়ের করি, কেমন হয় ? আদালত এ ব্যাপারে কী রায় দেয়, দেখাই যাক না !
ঠিক এরকম সময়েই ঘরে ঢােকে দীপক। অপরাজিতা উত্তেজিত ভঙ্গিতে দীপককে বলে - শােননা, শােননা, মা বলছে সংগ্রামের ভর্তির ব্যাপারে স্কুলগুলাে যা ব্যবহার করছে, তার বিরুদ্ধে কোর্টে কেস করতে।
| দীপক বিস্মিত স্বরে শুধু এটুকুই বলতে পারে – মা বলছে কোর্টে কেস করতে ! এ তাে সাংঘাতিক ব্যাপার!
( বছর চারেক পর )
দিন-রাত এক করে ফেলেছিল অপরাজিতা; সেই সঙ্গে দীপকও। উকিলের চেম্বার থেকে লােয়ার কোর্টে ছােটাছুটি, দিনরাত্তির পড়াশােনা করা, খবরের কাগজে চিঠিপত্র লেখা অরও কত কী! এক বছর ধরে মামলা চলার পর লােয়ার কোর্ট চিরাচরিত প্রথার পক্ষেই বা দেয়। ভেঙে পড়ে অভিমানী অপরাজিতা। রাতদিন ঘরের কোণে বসে অশ্রুপাত করতে থাকে। আবার সেই একই চিন্তা তার মাথায় ঘুণপােকার মতাে বাসা বাঁধে। ছেলেটার ভবিষ্যত স নিজেই নষ্ট করে দিল! কী ক্ষতি হত যদি গতানুগতিক প্রথায় সে চলত! সঙ্গে সঙ্গে আবার এ ও ভাবে - লড়াইয়ের ময়দানে নেমে পিঠ দেখানাে তাে ভীরুতার লক্ষণ !
অপরাজিতার প্রতি তাঁর নারীসুলভ সহানুভূতিটুকু বাদ দিলে, একদিক দিয়ে মনে মনে খুশি-হওয়া সুচরিতা খানিকটা সান্ত্বনা দেওয়ার ভঙ্গিতেই বলেন- এইভাবে ভেঙে পড়লে চলবে, মা? দরকার হলে আমরা হাইকোর্টে যাব। সুচরিতা ধরেই নিয়েছিলেন যে হাইকোর্টও সেই চিরাচরিত পথে হাঁটবে। অপরাজিতা সেখানেও পরাজিতা হবে আর তার আদরের দাদুভাইয়ের তাদের পদবি নিতে কোনও অন্তরায় থাকবে না।
অন্তর্নিহিত শ্লেষটুকু ধরতে না-পারা অপরাজিতা সুচরিতা'র স্তোকবাক্যে ভরসা পেয়েছিল। তার আগেই, খবরের কাগজে এই মামলা-ঘটিত রায়-এর প্রতিবেদন পড়ে হাইকোর্টে আপীল করার কথা তার মাথায় ঢুকিয়েছিল জয়দীপ, অপরাজিতার আর এক কলেজবন্ধু। হাইকোর্টে জনস্বার্থ-মামলার এক নম্বরের কারিগর। সে বলেছিল - তাের ভয় নেই অপু, আমি আছি তাের পাশে। খবরের কাগজে যেমন লেখালিখি করছিস এ ব্যাপারে, সেটা চালিয়ে যা; একটা জনমত তৈরি হােক তাের পক্ষে। তারপর ঠুকে দে আপীল।
শুরু হ’ল আবার দৌড়ঝাঁপ, আবার লেখালিখি, আবার চিন্তাভাবনা। কিন্তু এ সবের সম্মিলিত ধকল অপরাজিতার শরীর আর নিতে পারল না। হাজার হােক, রক্তমাংস’র শরীর, তারও তাে একটা সীমিত সহনক্ষমতা আছে! সকলেই টের পাচ্ছিল যে দীপশিখা ক্রমশ স্তিমিত হয়ে আসছে। তাই, বাড়ির সবাই মিলে এই অসম্ভব জেদি, দৃঢ়চেতা মেয়েটির সেবায় তৎপর হয়ে উঠল।
তার এই শেষ হয়ে আসাটা প্রথমে লক্ষ্য করেছিলেন নিখিলেশ। একদিন সন্ধেবেলা তিনি লক্ষ্য করেন সােফাতে এলিয়ে পড়ে রয়েছে অপরাজিতা; মুখে তার অবসাদ ও ক্লান্তির ছাপ প্রকট। অনেকবার ডাকলেন তিনি, কিন্তু পুত্রবধূর তরফ থেকে কোনও সাড়াশব্দ পেলেন না। এই বােধহয় প্রথমবারের মতাে তার ভিতরে একটা ভাবনা জাগ্রত হ’ল – আচ্ছা, ও যদি আমার মেয়ে হ'ত, পারতাম আমি এমন নির্বিকার থাকতে ! দেরি না করে, জল এনে অপরাজিতার চোখেমুখে জলের ঝাপটা দিলেন। আচ্ছন্নতা থেকে জেগে উঠে স্বাভাবিক হওয়ার চেষ্টা করে সে বলল - বাপি, তুমি ! দাঁড়াও তােমার জন্য চা নিয়ে আসি।
- না, কোথাও যাবি না। বােস এখানে। তাের কী হয়েছে বল আমাকে।
শ্বশুরের মুখ থেকে ‘তুই' সম্বােধনের উৎসটা আন্দাজ করতে পেরে আর নিজেকে ধরে রাখতে পারল না অপরাজিতা। দু হাতে মুখ ঢেকে রুদ্ধ স্বরে সে বলতে লাগল - আমি হেরে গেলাম বাপি,
ম বাপি। সেই সঙ্গে তােমাদের সকলকে ডুবিয়ে দিয়ে গেলাম। গে"""-না, হারিসনি তুই, কাউকে ডােবাসওনি। ওসব কথা থাক, তাের কষ্টটা কোথায় বল আমাকে। তুই তাে আমার সােনা মেয়ে।
| ফুঁপিয়ে কাঁদতে কাঁদতে অপরাজিতা বলে - আজকাল চোখের সামনে সব কেমন যেন প্রয়া ধোয়া দেখি। মাঝেমাঝে মাথায় অসহ্য যন্ত্রণা হয়। তারপর আমার কিছু মনে থাকে না।
| -ঠিক আছে, এটা কিছুই নয়। কালই আমরা ডাক্তারখানায় যাব। এখন আমার কাছে আয় তাে দেখি মা, আমি তাের মাথায় একটু হাত বুলিয়ে দিই। এভাবে ভেঙে পড়িস না, আমরা জিতবই। তাের সামনে এখন কত ... আটকে গেলেন নিখিলেশ। দেখলেন, আবার অচৈতন্য হয়ে পড়েছে সুচরিতা। নিজেকে আর ধরে রাখতে পারলেন না তিনি। পুত্রবধূর মাথাটা বুকে জড়িয়ে ধরে হাউহাউ করে কেঁদে উঠলেন। ঠাকুরঘর থেকে ছুটে এলেন সুচরিতা।
*****
*****
*****
দাউদাউ করে জ্বলছে চিতা; পবিত্র অগ্নি আপন করে নিচ্ছে অপরাজিতার পার্থিব শরীর। দূরে শ্মশানঘাটের এক কোণে বসে আছেন নিখিলেশ। যেন বােবা হয়ে গেছেন তিনি। মনে মনে নিজেকে দুষছেন - কেন যে আর কদিন আগে তিনি খেয়াল করেননি ! অবিবেচকের মতাে কেনই বা তিনি অপরাজিতার অসুস্থতার মধ্যে সুখবরটা দিতে গেলেন ...!
| সুখবরটা নিয়ে এসেছিল দীপক আর জয়দীপ। কিন্তু শােনানাে যায়নি অপরাজিতাকে। কেননা, তখন অচৈতন্য অপরাজিতাকে তােলা হচ্ছিল অ্যাম্বুলেন্সে। চেনাজানা নার্সিংহােমে আনা হয়েছিল তাকে। সঙ্গে সঙ্গে শুরু হয়েছিল চিকিঃসা। সারা রাত নিখিলেশ বসে ছিলেন পুত্রবধূর মাথার কাছে। মাঝরাত্তিরে একবার কিছুক্ষণের জন্য জ্ঞান ফিরেছিল অপরাজিতার। তখনই সুখবরটা শুনিয়েছিলেন নিখিলেশ - জানিস মা, হাইকোর্টে তুই জিতে গেছিস ...।
খবরটা শুনে চোখ বড়বড় হয়ে গিয়েছিল অপরাজিতার। মুহূর্তের জন্য সে চোখ দুটি অস্বাভাবিক ভাবে উজ্জ্বল হয়ে উঠেছিল। নিখিলেশ শুনিয়েছিলেন - ডাক্তার বলেছেন, প্রেশারটা সামান্য বেড়েছে। কাল সকালেই ছেড়ে দেবেন। তারপর বাড়িতে ফিরে গিয়ে জমিয়ে...
নিখিলেশের মুখের কথা মুখেই থেকে যায়। তার কোলে মাথা রেখে নিস্তেজ হয়ে যায়। অপরাজিতা; সেই সঙ্গে তার সব জেদ, সব বিদ্রোহ ...।
| চিতার সামনেই বসে ছিল দীপক। একটু দূরে দাঁড়িয়ে ছিলেন মনােমােহন, জয়দীপ, জয়ন্ত সরকার ... সবাই। পুত্রবধূর ইচ্ছেকে সম্মান জানিয়ে সামাজিক প্রথাকে বৃদ্ধাঙ্গুষ্ঠ দিয়ে শ্মশানে এসেছেন সুচরিতা। সংগ্রামকে বুকে জড়িয়ে ধরে আছেন তিনি। কাতারে কাতারে মানুষজন ছুটে আসছে। ... এত মানুষ ভালােবাসে অপুকে!
ভাবছিলেন নিখিলেশ।
( বাক্প্রতিমা পত্রিকার  প্রকাশিত গল্প )