Tuesday, January 22, 2019

এক বিশ্ব নাগরিক দেশনায়ক সুভাষচন্দ্র // সত্যেন্দ্রনাথ পাইন

 সত্যেন্দ্রনাথ পাইন


কল্যাণীয় শ্রীমান সুভাষচন্দ্র, স্বদেশের চিত্তে নতুন প্রাণ সঞ্চার করবার পূণ্যব্রত তুমি গ্রহণ করেছ, সেই কথা স্মরণ করে তোমার নামে'তাসের দেশ' নাটকটি উৎসর্গ করলুম-- রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, শান্তিনিকেতন, মাঘ ১৩৪৫!!
  উপরোক্ত লেখাতেই স্পষ্ট কবি সুভাষ চন্দ্র কে নতুনের দূত হিসেবে বরণ করে নিয়েছিলেন।"সেই সময়ে"ইংরেজদের বিরুদ্ধে স্বাধীনতা আন্দোলনে নেতাজী দেশবাসীর মনে যে অভাবনীয় নতুন দিগন্ত উন্মোচন করলেন তা কবিকে ভীষণভাবে নাড়া দিয়েছিল--- ।
   প্রখ্যাত অধ্যাপক মোহনলাল মিত্র লিখেছেন, " তাসের দেশ" নাটকটির হাস্যকৌতুকের অন্তরালে যে মর্মকথাটি গুঞ্জরিত তার সঙ্গে সুভাষের চরিত্রের সাদৃশ্য বর্তমান'"।
  সুভাষচন্দ্র খদ্দরের ধুতি পাঞ্জাবি আর সাধারণ সাদা শাল গায়ে দিতেন।এটাই তাঁর ক্লাসিক স্টাইল ( চন্দ্রকুমার বোসের) লেখা থেকে জানা যায়।। খাঁটি বাঙালি পোশাকে এক ভদ্রদুরস্ত বাঙালি ভদ্রলোক। সেই সময় পশ্চিমী সভ্যতার প্রভাবে এক শ্রেণীর মানুষ যখন পশ্চিমী পোশাকে ভদ্রলোক বললেন অভিহিত হতে চাইতেন। সুভাষচন্দ্র ছিলেন সম্পূর্ণ ব্যতিক্রমী মানুষ-- তিনি বাঙালি- ঐতিহ্যের প্রতি অত্যন্ত শ্রদ্ধাশীল ছিলেন।এই বাঙালিয়ানার গর্বে গর্বিত হয়ে লিখলেন, " দ্য বেঙ্গল ইয়ুথ ইনস্পাইট অব হিজ মেনি ফেলিংস পজেসেস, ইন এমব্রায়ো অ্যাট লিস্ট সাম অব দ্য নোবেলেস্ট  ট্রেটস ইন হিউম্যান ক্যারেক্টার, মাই ওন ফেথ ইন দ্য ক্যাপাসিটি এ্যান্ড ফিউচার অব দ্য বেঙ্গলি ইয়ূথ ইজ আনবাউণ্ডেড"। অথচ তিনি মোটেও শাভিনিষ্ট ছিলেন না।
  সম্পুর্ন বাঙালি পরিবারে ও পরিবেশে তিনি বেড়ে ওঠেন। তাঁর পরিবারের সদস্যরা কণ্ঠ সংগীতে ও যন্ত্র সংগীতের ওপর ঋদ্ধ ছিলেন যেমন, তেমন রামায়ণ, মহাভারত নিত্য পাঠ্য ছিল। লোক সংগীত চর্চা ও ছিল সমানে। বাড়ির রান্নাও ছিল পুরোপুরি বাঙালি ঘরাণার-- ভাত,  ডাল, সবজি, মাছ। তিনি তাঁর বৌদি বিভাবতী দেবীর তৈরি মাছের কচুরি খেতে খুব পছন্দ করতেন।বিভাবতী দেবী ছিলেন তাঁর দাদা শরৎ বোসের সহধর্মিনী। সুভাষচন্দ্রের মা প্রভাবতী দেবী বাড়িতে দুর্গাপূজা ও কালীপুজো করতেন। পিতা জানকীনাথ স্ত্রী প্রভাতীর মতই ধর্মপ্রাণ ছিলেন। কিন্তু হিন্দু সম্প্রদায়ের নানান সংস্কারেও মনোনিবেশ করেন। মা ছিলেন মা কালীর ভক্ত-- শাক্তের উপাসক। তাই স্বামী বিবেকানন্দের মতাদর্শে বিশ্বাসী হয়ে বেদান্ত দর্শনে বিশ্বাসী হয়ে ছিলেন।
   বাংলার ঐতিহ্য, শিল্প, কৃষ্টি, ধর্মীয় ভাবধারায় তাঁর চিন্তা ও মনন বাংলায় তাঁকে প্রতিষ্ঠা দিয়েছিল।তাতেই তিনি জয় করেছিলেন সমগ্র ভারত ও সমগ্র এশিয়া।
  দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের আগে ও পরে তৎকালীন জাপানের বিদেশমন্ত্রী মামরু শিগেমিৎসু সুভাষচন্দ্রকে " হিরো অব এশিয়া" বলে অভিহিত করেন। ইউরোপে স্বেচ্ছা নির্বাসনে থাকার সময় সুভাষচন্দ্র সমগ্র ইউরোপ ঘুরে দেখেন। অষ্ট্রিয়া, জার্মান, চেকোস্লোভাকিয়া, ইত্যালি, আয়ারল্যান্ড সহ বিভিন্ন দেশে ঘুরে বন্ধুত্ব স্থাপন করে হয়ে ওঠেন "বিশ্ব নাগরিক"।
 ১৯১৪ সালে সুভাষচন্দ্র প্রেসিডেন্সি কলেজে পড়তেন।
এই সময় বন্ধুদের নিয়ে তিনি কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সাথে দেখা করে কিছু উপদেশ নিতে যান। আর--
  ঐ প্রেসিডেন্সি কলেজের ইতিহাসের  অধ্যাপক ওটেন সাহেবের সাথে বচসায় বহিষ্কৃত হলে রবী কবি ' ছাত্রশাসনতন্ত্র" নামে এক প্রবন্ধে এর তীব্র বিরোধিতা করেন। উক্ত প্রবন্ধটি ইং রেজী অনুবাদ করে মডার্ন রিভিউ পত্রিকায় ছাপানোর ব্যবস্থা করে লর্ভ কারমাইকেলের কাছে পাঠান শাস্তি মুকুবের আশায়।
  অথচ সিটি কলেজের সরস্বতী পুজো নিয়ে রবীন্দ্রনাথ ও সুভাষচন্দ্রের মধ্যে ‌‌‌তীব্র মতবিরোধ ঘটে।মোহনলাল মিত্রের মতে "কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সাথে ঘনিষ্ঠতা হতে প্রচুর সময় লেগেছিল" । তবু দুজনেই দুজনকে খুব বুঝতেন, জানতেন। রবীন্দ্রনাথ প্রায়শই সুভাষের খোঁজ নিতেন। রবীন্দ্রনাথ নেতাজীর অনুরোধেই Bengal Provincial Congress Fund and Famine Relief Committeeর সভাপতি হন। আগে যে পদে ছিলেন আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র রায় মহাশয়।
    The Indian Struggle নামে লেখা বইয়ের পাণ্ডুলিপি ইং রেজরা বাজেয়াপ্ত করলে রবীন্দ্রনাথ তীব্র প্রতিবাদ করেন।
  সুভাষচন্দ্র রবীন্দ্রনাথকে অসম্ভব শ্রদ্ধা করতেন।সেই সুভাষবাবুর অনুরোধেই ১৯৩৯ সালে ১লা আগষ্ট কবি কলকাতায় কংগ্রেস ভবনের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন।
এবং ঐ ভবনের নাম কবি দেন "মহাজাতি সদন"।
  চণ্ডালিকা প্রথম অভিনয় হয় ছায়া প্রেক্ষাগৃহে এবং সেখানে কংগ্রেস সভাপতি হিসেবে সুভাষচন্দ্র হাজির হন প্রথম রাত্রেই।
  ত্রিপুরি কংগ্রেসের সভাপতি পদে নির্বাচনে কবি চাননি সুভাষচন্দ্র অংশ নিন। কারণ, তাঁর মতে এতে সুভাষের মর্যাদা ক্ষুণ্ন হবে। যদিও পরে তিনি তাঁর মত বদল করেন।
  ১৯৩৯ সালের ২১ জানুয়ারি শান্তিনিকেতনে গিয়ে ছিলেন নেতাজী। কবি সেখানে রাষ্ট্রনেতা হিসেবে স্বীকৃতি দিয়ে নেতাজীকে বিপুল সংবর্ধনা দেন।ঐ বছরই ৩১জানুয়ারি সভাপতি পদের জন্য নির্বাচন হয়। সেই নির্বাচনে কংগ্রেসের দলীয় প্রার্থী সীতারামাইয়াকে পরাজিত করে কমিউনিস্ট ঐ সোস্যালিষ্টদের ভোটে সুভাষচন্দ্র জিতেছিলেন। কিন্তু অল্পদিনের মধ্যেই তাঁকে সেই পদ থেকে পদত্যাগ করতে হয়।১৯৩৯ সালের আগস্ট মাসে তাঁকে দল থেকে সাসপেন্ড করা হয়, পরে বহিষ্কৃত হন। এখানেও রবীন্দ্রনাথ গান্ধীজীকে চিঠি লিখে
দলে ফিরিয়ে নিতে অনুরোধ করেছিলেন। কিন্তু গান্ধীজী
' পরিবারের বেয়াড়া ছেলে' বলে সুভাষচন্দ্র কে নতি স্বীকার করতে বলেন।
   ১৯৪১সালের ৭আগষ্ট রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের মৃত্যু হয়।তার আগে ১৯৪১এর ১৭ জানুয়ারি সুভাষচন্দ্র গোপনে ভারত ছেড়ে চলে গিয়ে সশস্ত্র বিপ্লবের পথে ঝাঁপিয়ে পড়েন।এরই প্রেক্ষিতে সাহিত্যিক তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায় সুভাষচন্দ্র কে শ্রদ্ধা জানিয়ে "চৈতালী ঘূর্ণি" উপন্যাস টি উৎসর্গ করেন।
 
 সূত্রঃ দৈনিক এই সময় ২৩ জানুয়ারি ২০১৫!
সত্যেন্দ্রনাথ পাইন। তথ্য ভুল থাকলে ক্ষমা করবেন।