বাংলা ভাষার ই-ম্যাগাজিন । যে কোনো সময় লেখা পাঠানো যায় । ই-মেলে লেখা পাঠাতে হয় ।

Monday, January 21, 2019

রাজেন্দ্রলাল মিত্র // রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

রাজেন্দ্রলাল মিত্র  //  রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

বাংলার সাহিত্যিকগণকে একত্র করিয়া একটি পরিষৎ স্থাপন করিবার কল্পনা জ্যোতিদাদার মনে উদিত হইয়াছিল। বাংলার পরিভাষা বাঁধিয়া দেওয়া ও সাধারণত সর্বপ্রকার উপায়ে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের  পুষ্টি সাধন এই সভার উদ্দেশ্য ছিল। বর্তমান সাহিত্যপরিষৎ যে উদ্দেশ্য লইয়া আবির্ভূত হইয়াছে তাহার সঙ্গে সেই সংকল্পিত সভার প্রায় কোনাে অনৈক্য ছিল না। রাজেন্দ্রলাল মিত্র মহাশয় উৎসাহের সহিত এই প্রস্তাবটি গ্রহণ করিলেন। তাঁহাকেই এই সভার সভাপতি করা হইয়াছিল।
যখন বিদ্যাসাগর মহাশয়কে এই সভায় আহ্বান করিবার জন্য গেলাম, তখন সভার উদ্দেশ্য ও সভ্যদের নাম শুনিয়া তিনি বলিলেন, “আমি পরামর্শ দিতেছি, আমাদের মতাে লােককে পরিত্যাগ করাে— ‘হােমরা চোমরাদের লইয়া কোনাে কাজ হইবে না, কাহারও সঙ্গে কাহারও মতে মিলিবে না।” এই বলিয়া তিনি এ সভায় যােগ দিতে রাজি হইলেন না। বঙ্কিমবাবু , সভ্য হইয়াছিলেন, কিন্তু তাঁহাকে সভার কাজে যে পাওয়া গিয়াছিল তাহা বলিতে পারি না।
বলিতে গেলে যে-কয়দিন সভা বাঁচিয়া ছিল, সমস্ত কাজ একা রাজেন্দ্রলাল মিত্রই করিতেন। ভৌগােলিক পরিভাষা নির্ণয়েই আমরা প্রথম হস্তক্ষেপ করিয়াছিলাম। পরিভাষার প্রথম খসড়া সমস্তটা রাজেন্দ্রলালই ঠিক করিয়া দিয়াছিলেন। সেটি ছাপাইয়া অন্যান্য সভ্যদের আলােচনার জন্য সকলের হাতে বিতরণ করা হইয়াছিল। পথিবীর সমস্ত দেশের নামগুলি সেই সেই দেশে প্রচলিত উচ্চারণ অনুসারে লিপিবদ্ধ করিবার সংকল্পও আমাদের ছিল।
বিদ্যাসাগরের কথা ফলিল— হােমরা চোমরাদের একত্র করিয়া কোনাে কাজে লাগানাে সম্ভবপর হইল না। সভা একটুখানি অঙ্কুরিত হইয়াই শুকাইয়া গেল। কিন্তু, রাজেন্দ্রলাল মিত্র সব্যসাচী ছিলেন। তিনি একাই একটি সভা। এই উপলক্ষ্যে তাঁহার সহিত পরিচিত হইয়া আমি ধন্য হইয়াছিলাম। | এ পর্যন্ত বাংলাদেশের অনেক বড়াে বড়াে সাহিত্যিকের সঙ্গে আমার আলাপ হইয়াছে, কিন্তু রাজেন্দ্রলালের স্মৃতি আমার মনে যেমন উজ্জল হইয়া বিরাজ করিতেছে এমন আর কাহারও নহে।  মানিকতলার বাগানে যেখানে কোর্ট অফ ওয়ার্ডস ছিল সেখানে আমি যখন-তখন তাঁহার সঙ্গে দেখা করিতে যাইতাম। আমি সকালে যাইতাম দেখিতাম, তিনি লেখাপড়ার কাজে নিযুক্ত আছেন।
অল্পবয়সের অবিবেচনা বশতই অসংকোচে আমি তাঁহার কাজের ব্যাঘাত করিতাম। কিন্তু, সেজন্য তাঁহাকে মহৎ কালও অপ্রসন্ন দেখি নাই। আমাকে দেখিবামাত্র তিনি কাজ রাখিয়া দিয়া কথা আরম্ভ করিয়া দিতেন। সকলেই জানেন, তিনি কানে কম শুনিতেন। এইজন্য পারতপক্ষে তিনি আমাকে প্রশ্ন করিবার অবকাশ দিতেন না। কোনাে একটা বড়াে প্রসঙ্গ তুলিয়া তিনি নিজেই কথা কহিয়া যাইতেন। তাঁহার মুখে সেই কথা শনিবার জন্যই আমি তাঁহার কাছে যাইতাম। আর কাহারও সঙ্গে বাক্যালাপে এত নতুন নতুন বিষয়ে এত বেশি করিয়া ভাবিবার জিনিস পাই নাই।
আমি মুগ্ধ হইয়া তাঁহার আলাপ শুনিতাম। বােধকরি তখনকার কালের পাঠ্যপুস্তক-নির্বাচন সমিতির তিনি একজন প্রধান সভ্য ছিলেন। তাঁহার কাছে যে-সব বই পাঠানাে হইত তিনি সেগুলি পেনসিলের দাগ দিয়া নােট করিয়া পড়িতেন। এক-একদিন সেইরূপ কোনাে-একটা বই উপলক্ষ্য করিয়া তিনি বাংলা ভাষারীতি ও ভাষাতত্ত্ব সম্বন্ধে কথা কহিতেন, তাহাতে আমি বিস্তর উপকার পাইতাম। এমন অল্প বিষয় ছিল যে-সম্বন্ধে তিনি ভালাে করিয়া আলােচনা না করিয়াছিলেন এবং যাহাকিছ তাঁহার আলােচনার বিষয় ছিল তাহাই তিনি প্রাঞ্জল করিয়া বিব্রত করিতে পারিতেন।
তখন যে-বাংলা সাহিত্যসভার প্রতিষ্ঠা চেষ্টা হইয়াছিল সেই সভায় আর কোনাে সভ্যের কিছুমাত্র মুখাপেক্ষা না করিয়া যদি একমাত্র মিত্ৰ মহাশয়কে দিয়া কাজ করাইয়া লওয়া যাইত, তবে বর্তমান সাহিত্য-পরিষদের অনেক কাজ কেবল। সেই একজন ব্যক্তি দ্বারা অনেকদূর অগ্রসর হইত সন্দেহ নাই। কেবল তিনি মননশীল লেখক ছিলেন ইহাই তাঁহার প্রধান গৌরব নহে। তাঁহার মতিতেই তাঁহার মনুষ্যত্ব যেন প্রত্যক্ষ হইত। আমার মতো অর্বাচীনকেও তিনি কিছুমাত্র অবজ্ঞা না করিয়া, ভারি একটি দাক্ষিণ্যের সহিত আমার সঙ্গেও বড়াে বড়াে বিষয়ে আলাপ করিতেন— অথচ তেজস্বিতায় তখনকার দিনে তাঁহার সমকক্ষ কেহই ছিল না। এমন-কি, আমি তাঁহার কাছ হইতে ‘‘যমের কুকু ” নামে একটি প্রবন্ধ আদায় করিয়া ভারতীতে ছাপাইতে পারিয়াছিলাম ; তখনকার কালের আর কোনাে যশস্বী লেখকের প্রতি এমন  করিয়া উৎপাত করিতে সাহসও করি নাই এবং এতটা প্রশ্রয় পাইবার আশাও করিতে পারিতাম না। অথচ যােদ্ধৃবেশে তাঁহার  ‍রুদ্রমূর্তি বিপজ্জনক ছিল।
ম্যুনিসিপাল-সভায় সেনেট সভায় তাঁহার প্রতিপক্ষ সকলেই তাঁহাকে ভয় করিয়া চলিত। তখনকার দিনে কৃষ্ণদাস পাল ছিলেন কৌশলী, আর রাজেন্দ্রলাল ছিলেন বীর্যবান। বড়াে বড়াে মল্লের সঙ্গেও দ্বন্দ্বযুদ্ধে কখনাে তিনি পরাঙ্মুখ হন নাই ও কখনাে তিনি পরাভূত হইতে জানিতেন না। এসিয়াটিক সােসাইটি সভার গ্রন্থপ্রকাশ ও পুরাতত্ত্ব-আলােচনা ব্যাপারে অনেক সংস্কৃতজ্ঞ পণ্ডিতকে তিনি কাজে খাটাইতেন। আমার মনে আছে, এই উপলক্ষ্যে তখনকার কালের মহত্ত বিদ্বেষী ঈর্ষাপরায়ণ অনেকেই বলিত যে, পণ্ডিতেরাই কাজ করে ও তাহার যশের ফল মিত্র মহাশয় ফাঁকি দিয়া ভােগ করিয়া থাকেন। আজিও এরূপ দৃষ্টান্ত কখনাে কখনাে দেখা যায় যে, যে-ব্যক্তি যন্ত্রমাত্র ক্রমশ তাহার মনে হইতে থাকে, “আমিই বুঝি কৃতী আর যন্ত্রটি বুঝি অনাবশ্যক শােভা মাত্র।”
কলম বেচারার যদি চেতনা থাকিত তবে লিখিতে লিখিতে নিশ্চয় কোন-একদিন সে মনে করিয়া বসিত, “লেখার সমস্ত কাজটাই করি আমি, অথচ আমার মুখেই কেবল কালী পড়ে আর লেখকের খ্যাতিই উজ্জল হইয়া উঠে।”  বাংলাদেশের এই একজন অসামান্য মনস্বী পুরুষ মৃত্যুর পরে দেশের লােকের নিকট হইতে বিশেষ কোনাে সম্মান লাভ করেন নাই। ইহার একটা কারণ, ইহার মত্যুর অনতিকালের মধ্যে বিদ্যাসাগরের মত্যু ঘটে— সেই শােকেই রাজেন্দ্রলালের বিয়ােগ বেদনা দেশের চিত্ত হইতে বিলুপ্ত হইয়াছিল। তাহার আর-একটা কারণ, বাংলাভাষায় তাঁহার র্কীতির পরিমাণ তেমন অধিক ছিল না, এইজন্য দেশের সর্বসাধারণের ‍হৃদয়ে তিনি প্রতিষ্ঠা লাভ করিবার সুযােগ পান নাই।

No comments:

Post a Comment