বাংলা ভাষার ই-ম্যাগাজিন । যে কোনো সময় লেখা পাঠানো যায় । ই-মেলে লেখা পাঠাতে হয় ।

Saturday, January 12, 2019

কর মুক্ত আড্ডা

 কর মুক্ত আড্ডা

আড্ডার মাচা

ছয় সাত জন বন্ধু মিলে তৈরী করলাম আড্ডার মাচা নামের একটা দল । এখানে কে ঠিক কথা বলছে , কে ভুল কথা বলছে বোঝা খুব মুশকিল । কারণ সবাই এখানে   বই এর পোকা , যখন যেটা হাতের কাছে পাচ্ছে পড়ে নিচ্ছে । মাঝে মাঝে দেখি খবরের কাগজের বিজ্ঞাপনের পাতাও পড়ছে । তো আমাদের আড্ডায় মাঝে মাঝে আসেন স্যর অ্যালবার্ট আইনস্টাইন , শ্রী চৈতন্য , ফ্রানজ কাফকা , আর্যভট্ট , লু সুন , অশোক , গৌতম বুদ্ধ , প্লেটো , ফ্রয়েড  । একদিন তর্ক উঠল পাবলো নেরুদা আর পাবলো পিকাসোকে নিয়ে , কেউ থামে না , চা ঠান্ডা হয়ে যায় , শুরু হয় চিৎকার , অর্ধেক কথা শোনা যায় না । তার মাঝে কে যেন এলোমেলো সুরে বাংলা হিন্দি গান গাইতে থাকে তর্ক থামানোর জন্য । ভাগ্যিস সেদিন খাবার জল শেষ হয়ে গিয়েছিল না হলে তো গলা না শুকালে তর্ক থামতো  না । আড্ডা মাচায় যারা যারা উপস্থিত থাকি তারা মোটামুটি কমবেশী সবাই কিছু না কিছু লিখি , কবিতা , ছড়া , গল্প , প্রবন্ধ । নিজেদের ভুল ভ্রান্তি নিয়ে আলোচনা হয় , আলোচনা পর্বে উঠে আসে শব্দ এবং ছন্দ ব্যবহারের কথা । কেন আমরা আড্ডায় সামিল হই তার একটা র্ফদ দেওয়া যাক ।
এক : সারাদিনের ক্লান্তি দূর হয় ,
দুই : সংসারের কোনো কথা মনে পড়ে না ।
তিন : নিজের কথা খোলামেলা ভাবে ছড়িয়ে দেওয়া যায় ।
চার : শরীরে যে রোগ দৌড়ে বেড়াচ্ছে তা বেমালুম ভুলে যায় মন ।
পাঁচ : এ পাড়া ও পাড়া সব পাড়ার খবর খুব দ্রুত সংগ্রহ করা যায় ।
ছয় : অতীতের সোনালী দিন গুলোকে স্মরণ করে তা শ্রদ্ধা পর্যায় তুলে নিয়ে যাওয়া যায় ।
সাত : নিজের  জ্ঞানের মহাকুম্ভের কথা প্রচার করতে এক পয়সা খরচ হয় না ।

আরো তালিকা আছে যা সবার  কাছে বলা ঠিক হবে না ।



ব্যক্তিগত ঘুড়ি
.....................

অনেকদিন ধরে ভাবছি , একটা কবিতা লিখবো , সেই মতো কলম খাতা নিয়ে বসলাম , হল না লেখা , কারণ সেদিন আশেপাশে খুব দৌড়ঝাঁপ চলছিল , আগুনের মতো ছড়িয়ে পড়ল একটাই খবর -  পাড়ায় নামকরা শিল্পীরা আসছেন তাই কোন কোন বাড়ি থেকে চাঁদা নেওয়া হবে তার একটা হিসেবনিকেশ চলছে , লিখতে পারি না বলে এটা আমার এক ধরণের অজুহাত , ভাবলাম কবিতা না লিখে একটা প্রবন্ধ লেখা যাক , সেই আবার বসলাম , লিখতে আরম্ভ করলাম , হল - এবার লেখা শেষ হল , কোথায় ছাপাই , কয়েকটি পত্রিকায় পাঠালাম , সব জায়গা থেকে লেখাটা ফেরৎ এল , শুধুমাত্র একজন সম্পাদক রাজি হলেন - কিন্তু তিনি বললেন টাকা দিতে হবে , আর কম করে দশ কপি পত্রিকা আমাকে কিনতে হবে ।  আমি রাজি হলাম , টাকা দিলাম , অপেক্ষা করতে লাগলাম …. মাস দুয়েক পর খবর এল সম্পাদক মহাশয় প্রেস শুদ্ধ পত্রিকার যাবতীয় দায়দায়িত্ব অন্য এক ব্যক্তিকে দিয়ে তিনি দিল্লি চলে গেছেন নতুন চাকরীর সন্ধানে , আমি সেই ব্যক্তির কাছে গিয়ে আমার লেখাটার কথা উল্লেখ করলাম - তিনি হাসতে হাসতে এবং কাশতে কাশতে বললেন - আমি যেখানে যাই আপনার মতো কিছু লেখকের পাল্লায় পড়তে হয় যাদের সারা জীবন দাবী থাকে - আর সেই দাবীর কোনো মানে হয় না । কার কাছে লেখা দিয়েছেন আর কার কাছে লেখা ছাপানোর কথা বলছেন । সহজ কথাটা সরল ভাবে ভাবুন । সব কিছু ভুলে শেষে ভরতি হলাম গল্প লেখা শেখার স্কুলে - যত জন আমার চেনা জানা ছিল সকলের বাড়ি বাড়ি গিয়ে বলে এলাম , গল্প লেখা আমার পেশা  হবে । কি ভাবে গল্প লিখতে হয় তার জন্য আমি একটা কোর্স করছি । একজন বন্ধু চায়ের দোকানে বসে জিজ্ঞেস করলো - পারবি তুই , তোর কি কোনো অভিজ্ঞতা আছে । আগে কখনো চেষ্টা করেছিস ইত্যাদি ইত্যাদি । আমার উত্তর ছিল - হবে , আমার দ্বারা হবে ।
ক্লাস শুরু হল - প্রথম দিন , বলা হল  , গল্প লেখার আগে পাঠক খুঁজতে হবে । বুঝতে হবে পাঠকের ইচ্ছে কি ? কি ভাবে পাঠক খুঁজতে হবে - তার ক্লাস আলাদা হবে । যাকে বলে   advance level কোর্স । সেখানে দিতে হবে আরো কিছু টাকা । তবে ১০% ছাড় পাবে , যারা অন্যান্য ক্লাসগুলো করবে । পাঠক খোঁজার রীতি নীতি মালা ভয়ঙ্কর রহস্যময় । দিনে যে সব পাঠক পাওয়া যায় তারা নাকি ফাঁকিবাজ , গভীর রাতের পাঠক  শ্রেণী খুব উচ্চ মার্গের হয় । তাদের দর বেশী । আমি advance level কোর্স করলাম । সমস্ত কোর্স শেষ করে মোট চারটি সার্টিফিকেট পেলাম । এইবার শুরু হল আমার পাঠক খোঁজার পালা । দিনে রাতে মিলিয়ে আট দশটা পাঠকের খোঁজ পাওয়া গেল - হিসেব মতো তাদের ইচ্ছের কথা শুনলাম , বেশীর ভাগ পাঠকের দাবি , আমি যেন এমন একটা গল্প লিখি যেখানে উল্লেখ থাকবে কি ভাবে মোটা থেকে রোগা হওয়া যায় চারদিনে । রাজি হলাম , লিখতে বসি রোজ , অল্প অল্প করে গল্পের নায়ক নায়িকাকে রোগা হওয়ার জন্য নানা টোটকা দিতে থাকি , নায়িকা রাজি হলে - নায়ক রাজি হয় না । কারণ নায়ক প্রতিদিন মাছের ঝোল দিয়ে  ভাত খেয়ে দুপুরে ভাত ঘুম দেয় , ঘন ঘন নাক ডাকে । এই সব কথাবার্তা গুলো পাঠককে জানালাম , দুপক্ষের মধ্যে একটা বৈঠকের আয়োজন করলাম , কিন্তু সমাধান বের হল না । তাই আমাকে আবার নতুন করে advance level কোর্সের জন্য ভর্ত্তি হতে হল । একটা করে কোর্স করছি আর একটা করে সমস্যা চোখের সামনে চলে আসছে ।

--------------------------------
-------------------------------------
কোথায় চলেছি ... কার সাথে চলেছি , কোথায় যাব , মনে মনে সাজিয়ে রাখা পথগুলোর ম্যাপ কার সাথে হিসেব মেলাতে গিয়ে বার বার ভুল করে বসে । কে আছে আড়ালে আড়ালে অন্ধকারে পায়ের তলায় দু চারটে জোনাকি ছড়িয়ে দিয়ে যায় । কাকে দেখছি  , কে আমাকে দেখছে ? 


---------------------------------------------------------------

শূন্যজীবি
-------------


স্মৃতিকে বেশ যত্ন করে লুকিয়ে রাখা যায় , কোনো খাতার পাতায় , গাছেদের আঙুলে আর ছেলেবেলার স্কুলের মাঠে ,এক দাড়িধারী ব্যক্তি , যাঁর মুখ বেয়ে পড়ছে - জ্যোতির ফুলকি , সে ব্যক্তি আমার উদ্দ্যেশে ঘোষনা করলেন  - স্মৃতি-শূন্য মানুষের সন্ধান পাওয়ার ফরমূলা তাঁর জানা আছে , শুধু সময়ের অপেক্ষায় আছেন তিনি , পৃথিবীতে নাকি এমন কেউ কেউ আছেন যাঁরা কোনো স্মৃতি নিজের কাছে রাখেন না , বিলিয়ে দেন , দান করে দেন , তাও আবার বিনামূল্যে  । আমি বললাম এ তো আমিও পারি , তেমন কোনো বড়ো কথা নয় , হ্যাঁ হ্যাঁ খুব পারবো , মাথাটা পুরো খালি করে রাখতে হবে , তাই তো , মানে মাথার মধ্যে কোনো কথা রাখা যাবে না । পারবো বৈকি , কিন্তু সেটা কতক্ষণ ? ক্ষনে ক্ষনে তো সেই আবার আগের কথা খুব জোরে চেপে ধরবে  আমায় । তাহলে কি সত্যি কোনো পদ্ধতি আছে - স্মৃতি না ধরে রাখার , সে ব্যক্তি আমায় খুব আলতো করে বললেন - সবার পক্ষে এ কাজ করা সম্ভব নয় , দিনের পর দিন ভাবনাকে কাছে ঘেঁষতে না দেওয়া । কিন্তু এটাও তো একটা ভাবনা - স্মৃতি-শূন্য হওয়া , আমি কতজনকে দেখেছি সকাল বেলা উঠে আগে একটা ফর্দ নিয়ে বসেন - কখন বাজার যাবে , কচি পাঁঠা কিনবেন , অতিথিদের আপ্যায়ন করার জন্য । তারপর সংসারের নানা কাজ , একদল মহামানব আছেন যাঁরা কেবল ফন্দি খোঁজেন এমন দূষিত-স্মৃতি তৈরী করার যেটা দিয়ে আর দশ-পাঁচটা মানুষকে অহেতুক দুর্বল করে দেয় । পরিবেশ দূষনের মতই ততটাই ভয়ঙ্কর দূষিত  এই স্মৃতি । আজ তাই এক প্রান্তের মানুষ হয়তো ভাবছেন কি ভাবে শুদ্ধ স্মৃতি বিক্রি করে ধনী হওয়া যায় , আমার তো বেশ লাগে ছেলেবেলার কথাগুলো রসিয়ে-বসিয়ে সবার কাছে বলে বেড়াতে । কোনো না কোনো ভাবে এটা প্রমানিত যাঁর স্মৃতি যত অধিক শিক্ষিত - সে নাকি তত বেশি এগিয়ে সবার চেয়ে , হয়তো তাই । সেই দাড়িধারী ব্যক্তি কেন এমন প্রমান করতে ব্যস্ত যে স্মৃতি-শূন্য মানুষ সবচেয়ে বেশি এগিয়ে । এটা অসম্ভব , কোনো মতে মানা যায় না । যেখানে গোটা বিশ্বটাই স্মৃতির ভিতের উপর দাড়িয়ে । আমি কি করে কল্পনা করে নেব আমাকে সম্পূর্ন ভাবে অাগের কোনো কথা না ভেবে বেঁচে থাকতে হবে ।  
--------------------
-------------------


গুগুল বাবুর গুণ
Googleকে প্রথম  আমি দেখি চায়ের দোকানে , বন্ধুরা আড্ডা  দিচ্ছে আর কথায় কথায় Google Google বলে চিৎকার করছে ,  কে এই Google ? বলি - থাকেটা কোথায় ? পরে জানলাম এর নাম Search Engine , ও বাবা এত ইঞ্জিন দেখেছি , কিন্তু এমন সাত পাঁচ জানা ইঞ্জিন চোখে পড়েনি । সে কত উত্তর দিতে পারে , যা জানতে চা্ইবো তার হদিস দেবে । বাঃ বেশ তো , তাহলে বন্ধুত্ব হোক Google দার সঙ্গে ।  
যত দিন যায় ততই যেন আমাকে আমার মন থেকে ছিনিয়ে  নিতে চায় গুগুলদা , বাসে , ট্রেনে , অটো রিক্সায় , সাইকেলে , গাছ তলায় ছায়ার মত পিছু   ছাড়ে না , যখন খেতে বসি তখনও , অনেক দিন পর দেখা হল এক স্যারের সঙ্গে , তাঁকে বললাম আমার গুগুলের কথা , সে সব কথা শুনে হাসতে লাগল , তাঁর হাসি দেখে আমিও বোকার মত হাসতে লাগলাম , জানি না এটা উপযুক্ত হাসির কারণ কিনা । শেষে যাবার সময় বলে গেলেন - তুই কি পারবি গুগুলের সাথে বন্ধুত্ব রাখতে , দেখ তোর তো আবার অনেক ইগোর সমস্যা আছে । কেউ কিছু বললে নাক ফুলে যায় , আরে বাবা সবাই কি সব কিছু জানে নাকি ?
আমার প্রিয় বন্ধু কমল বেশ কিছু দিন চাকরি সূত্রে অন্য শহরে ছিল , তার সাথে ফোনে প্রায় কথা হত । বিশেষ করে পাড়ায় আড্ডা দেবার কথাটা আমরা কেউ ভুলেনি , চানাচুর মুড়ি , তেলে ভাজা মুড়ি , বছরে একবার জম্পেশ করে মুরগির মাংস দিয়ে পিকনিক , ফুটবল মাঠে গোল নিয়ে হট্টোগোল , অভিমান , মনোমালিন্য, থেকে থেকে অচেনা জায়গায় বেড়াতে যাওয়া । বেশ ছিল সেই দিনগুলো , বোধহয় বয়স আর সংসারের চাপে অনেক কিছু থেকে নিজেকে গুটিয়ে নিয়েছি । আজ আমার বন্ধু    কমলের সাথে আড্ডা দেবো বলে অফিস থেকে ছুটি নিয়েছি । পর পর চারদিন অফিসে যাব না । কমল আর তার দলবল মানে তার নতুন বন্ধুদের নিয়ে আমার বাড়ির ছাদে আসবে আড্ডা দিতে । আমাদের আড্ডা চলবে ওই ধরো ঘন্টা ছয়েক । তার মাঝে অবশ্যই খাওয়া দাওয়ার ব্যাপারটা থাকবে । রান্নাবান্না সব তৈরী , ডাল , বেগুন ভাজা , পাঁপর , ভাত , মাছ আর চাটনি । ওরা ঠিক দশটার সময় আসবে ।

হল - আমাদের আড্ডার আসর গতকাল শেষ হল , সব ঠিকঠাক ছিল , কমলকে আমি খেতে খেতে গুগুলের কথাটা বলেছি , আর নানা ভাবে নিজের অভিজ্ঞতার কথাও তুলে ধরেছি , কমল সব র্ধৈয্য ধরে শুনেলো , আমি দেখলাম ও খুব বুঝেশুনে উত্তর করে । তাই ছোট্ট করে বলল - গুগুল যা জানে , তা জানে না যতক্ষণ না তুই না জানাবি । তবে হ্যাঁ গুগুল যা জানে , তার পরিমাণ অনেক বেশী , কিন্তু অনন্ত নয় । একট মানুষ যা জানে - গুগুল তার চেয়ে বেশী জানে , কিন্তু পৃথিবীর সব মানুষ যা জানে - গুগুল তার অর্ধেকও জানে না ।

সমাপ্ত


No comments:

Post a Comment