Sunday, January 13, 2019

যােগ-বিয়ােগ // মুকুল মাইতি



নবনীগােপাল ঘােষ মাত্র বছরখানিক হ’ল অবসর নিয়েছেন। হঠাৎ একদিন গড়িয়ার মােড়ে দেখা হয়ে গেল কার্তিক বােসের সঙ্গে। কার্তিক পনেরাে বছর আগে রিটায়ার্ড হয়েছেন। চার বছর আগে একবার দেখা হয়েছিল নবনীর সঙ্গে। কী যেন একটা কাজে অফিসে এসেছিলেন। এখন ফুল পেনশনভােগী। দিব্যি বহাল তবিয়তে আছেন। 

গা’র রং আগের চেয়ে খােলতাই হয়েছে। কোমরে কোনরকম জ্যতা নেই। মিলিটারিদের মতাে সিধে হয়ে হাঁটছেন। চোখে চশমা পর্যন্ত নেই। গালে গর্ত নেই অর্থাৎ দাঁতগুলাে এখনও অক্ষত রয়েছে। ভরা যৌবনের প্রায় সব লক্ষণ-ই বিদ্যমান। কথা শুরু হয়ে গেল। প্রথমেই কার্তিক বােসের চোখে পড়েছে।

-কী হে নবনীগােপাল, এর মধ্যেই একেবারে বুড়িয়ে গেলে? সবে মাত্র তাে এক বছর রিটায়ার্ড হয়েছ। বুড়িয়ে গেলে না বলে আমার বলা উচিত ছিল মুড়িয়ে গেলে। ভুলের জন্য মাফ চাইছি।

- অবসরের আগে তবু শরীরটা ভালাে ছিল। একটা বাঁধাধরা নিয়মের মধ্যে ছিলাম। সময় মতাে অফিসে যাওয়া-আসা ছিল। একেবারে রুটিন বাঁধা। সে সব এখন চুকেবুকে গেছে। বর্তমানে এই ভগ্ন কাঠামােটা টেনেটুনে নিয়ে কোনমতে চলছি।

- তা তাে চোখের সামনে দেখতেই পাচ্ছি। বলি, কে তােমাকে ওই রুটিন মেনে চলতে মানা করেছে? ইচ্ছে থাকলেও অবসরের পরেও রুটিন মানা যায়। এই শর্মাকে দেখে তা আন্দাজ করতে পারছ না? তা একটু চা-সেবন হবে নাকি? চল, নন্দরামের দোকানে গিয়ে একটু বসি। অনেকদিন তােমার সঙ্গে দেখা হয়নি। সহজে আজ তােমায় ছাড়ছি না। জমিয়ে আড্ডা দেওয়াও হবে আর দু-চারটে রসগােল্লাও মেরে দেওয়া যাবে।

- বল কী হে? তােমার কী মাথা খারাপ হ’ল? এই বয়সে চার দোকানের বেঞ্চে বসে ছােকরাদের মতাে আড্ডা মারব? লােকে কী বলবে? তা ছাড়া ওখাবে ছেড়েছুডে দিয়েছি। ডাক্তারের নিষেধ আছে।

-আচ্ছা, আচ্ছা। না হয় তুমি কিছুনা-ইবাবে। কিন্তু আমি তাে যেতে পারি। চল , একদিন না হয় একটু সঙ্গ দেবে। বসে কথাবার্তা বলবে। | যদি কারও নজরে পড়ে যাই, তাহলে আর রক্ষা থাকবেন। বাড়িতে এক্সোরে ধুন্ধুমার কাণ্ড ঘটে যাবে। বাড়ির লােক ভাববে ডাক্তারের নিষেধ অমান্য করে আমি লুকিয়ে চুরিয়ে মিষ্টি সাঁটাচ্ছি। আমাকে মাফ করিস ভাই। তার চেয়ে বরং অন্য কেহ বাদ বসতে চাও, তাে আপত্তি নেই। চল, কোনও পার্কে গিয়ে বসি। হলে হয়ত পারিবারিক অশান্তির হাত থেকে রেহাই পাওয়া যাবে।

- তাই চল, পার্কে গিয়ে বসা যাক। তােমার মুখে, তােমার বর্তমান নিপলে * গল্প শােনা যাবে। তােমায় দেখে, তােমার অবস্থা বেশ শ বলে মনে হচ্ছে।

জীবনের প্রাত যেন বাতিশ্রদ্ধ হয়ে পড়েছ। এত হতাশ হওয়ার কিছু আছে বলে হয় না!
– তমি তা বুঝতে পারবে কী করে? তােমার মতাে লােকের বােঝার কথাও নয়, বেশ নাদুশনুদুশ চেহারাটি বাগিয়েছ। তেল চুকচুকে শরীর নিয়ে বেশ খােশমেজাতে রয়েছ। তােমার তাে ফুর্তির সময় চলছে হে!

- ইচ্ছে করলে গায়-গতরে মাংস লাগিয়ে, নাদুশনুদুশটি হয়ে তুমিও কাটাতে পার। বাধাটা কোথায় ?
– এ বয়সে ঠাট্টা-ইয়ার্কি ভালাে লাগে না, বুঝলে?

– ঠাট্টা একেবারেই করছি না নবনী। বিশ্বাস কর। যােগের দিকে ঝুঁকে পড়তে বলছি তােমায়। দেখবে শারীরিক, বহু সমস্যার সমাধান হয়ে গেছে। তুমি কি কখনও রামদেব বাবাজীর নাম শুনেছ?
– অনেক রামনাম করেছি। ও-সবে কিছু হয় না। ও সব পরকালের জন্য তুলে রাখ।

- তােমাকে রামনামের মাহাত্ম্যর কথা বলছি না। বলছি বাবা রামদেবের কথা। আস্থা চ্যানেল কোনদিন খুলে দেখেছ? খুলে দেখলে জানতে পারবে। যােগ ... যােগাসন করার কথা তােমাকে কেউ কী বলেনি? আশ্চর্য!

– অন্য কোনও কথা থাকলে বল। এই বয়সে যােগ-বিয়ােগ শেখাতে এসাে না।

- একটু চোখ মেলে দেখ তাে। ও-ই যে দূরে গাছের নীচে শতরঞ্চি পেতে মুনির মতাে ধ্যানস্থ হয়ে বসে রয়েছেন, উনি কি তােমাকে আকর্ষণ করতে পারছেন না? আমি বাড়ি ফিরে ওইরকম ধ্যানস্থ হয়ে বসব। আমার শরীরের চেকনাই ওই যােগাসনের দান বলতে পার। তােমার যে বিয়ােগ-পর্ব চলছে তা তাে স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছি।

– কথার মাঝখানে কথা বলার জন্য আমি মাফ চাইছি। আমি এখন যােগের পরের স্টেজে এসে গেছি। এখন আমার বিয়ােগপর্ব চলছে।

- এতক্ষণে একটা কাজের কথা বলেছাে, নবনীগােপাল। ওইটি বিহনে অকালে তােমার বিয়ােগপর্ব শুরু হয়ে গেছে। যন্ত্রপাতি একেবারে অকেজো হওয়ার আগে একটা মেরামতি পর্ব থাকে। তা তুমি অবহেলা করেছ। মাঝে মাঝে সামান্য হলেও যদি একটু মেরামতির দিকে নজর দিতে তা হলে আজ তােমার এই দশা হত না। এখনও শুরু করার সময় আছে। এর কোনও বয়সের ঊধ্বসীমা নেই। লক্ষ লক্ষ মানুষ এর কল্যাণে সুস্থ সবল হয়ে জীবন কাটাচ্ছে। এই শরীরসাধনার জন্য তােমায় কোনও যােগীবাবার আশ্রমে দৌড়তে হবে না। নিজের ঘরে বসে তুমি বাবাজী সাজতে পার। যা হারিয়েছ তার কিছু তমি উদ্ধার করতে পারবে বলে মনে হয়। লেগে পড় হে। কোনও দ্বিধা-সংকোচের কারণ আছে বলে আমার মনে হয় না। বেটার লেট দ্যান নেভার।

- দ্বিধা-সংকোচের অনেক ব্যাপার আছে। তােমাকে সে সব বােঝাতে গেলে অনেক সময় লাগবে।
- লাগুক সময়। তুমি আমাকে তােমার মনের কথা খােলসা করে বলতে পার। আমি তােমার সহকর্মী ছিলাম। আমার কাছে লজ্জার কিছু নেই। তা ছাড়া গাছের তলায় শতরঞ্চি পেতে বসা ভদ্রলােকটির পরামর্শ চাইতে পার - ক্ষতি কী? মনে হচ্ছে এর যাওয়ার সময় হয়ে এসেছে। ওর পরামর্শ চাও। যখন আমার কথায় তােমার প্রত্যয় হচ্ছে না।

কার্তিক বােস নবনীকে সঙ্গে করে ভদ্রলােকের কাছে হাজির হলেন। শতরঞ্চি গােটানাের পর্ব সারতে চলেছেন তিনি। আগ বাড়িয়ে কার্তিক বােস বসলেন।

- স্যার, যদি কিছু মনে না করেন, একটা কথা আপনাকে জিগ্যেস করতে পারি? - তাড়াতাড়ি বলে ফেলুন। আমার একটু তাড়া আছে।

- আমার অবসরপ্রাপ্ত সহকর্মীটি আপনার যােগ-প্রাণায়াম সম্পর্কে কয়েকটি প্রশ্ন করতে চায়। যদি অনুমতি দেন।

– এতে সংকোচের কী আছে? আমাদের ভারতবর্ষে উপদেশ-পরামর্শ দিতে কেউ পিছিয়ে থাকে না। আমার অনুমান, এ বিষয়ে আপনারাও অগ্রণী ভূমিকা নিতে পারেন। কী ঠিক বলেছি কিনা? সামান্য অসুস্থ হলে কতজন লোেক যে ডাক্তারি পরামর্শ দিতে এগিয়ে আসেন, তা তাে সকলেই জানি। এই দেখুন না পরামর্শ দানের কথা উঠতেই কতগুলি এক্সট্রা কথা বলে ফেললাম।

- বলছিলাম কী, আপনি কী যােগ-প্রাণায়াম করে কিছু লাভ ওঠাতে পেরেছেন?

-বলেন কী মশাই? জন্ম থেকেই তাে এই যােগের ব্যাপারটা চলে আসছে। যােগ ছিল বলেই পৃথিবীতে আসা সম্ভব হয়েছে। যতদিন যােগ ছিল ততদিন নিজে খাওয়ার প্রশ্ন ওঠেনি। কি ঠিক বলছি কিনা বলুন? মা খেলেই, শিশুর বেড়ে ওঠা, খাওয়া। যােগের কী মহিমা।

- না, আমরা সেই নাড়ির যােগের কথা জানতে চাইছি না। এই যে গাছের তলায় বসে এতক্ষণ ধরে যােগ-প্রাণায়াম করলেন, তার কথাই জানতে চাইছি।

- মশাই, লাভ না হলে কী কেউ এত সময় ব্যয় করে? এত খুবই সহজ সরল কথা। নিয়মিত এর সাধনা করলে ফল পেতে দেরি হবে না। নিজের শারীরিক উন্নতির কথা নিজেই অনুভব করতে পারবেন। এ রীতিমতাে বিজ্ঞানচর্চাও বলতে পারেন। এর কোনও বিকল্প নেই মশাই। জিমে গিয়ে কোনও খরচাপাতির ব্যাপার নেই। অথচ এর উপকারিতা অসীম।

-কী হেনবনী, শুনলে তাে? আমার কথায় তােমার প্রত্যয় হচ্ছিল না। মুনি-ঋষিরা । দীর্ঘায়ু হতেন কেন? এর প্রধান কারণ ছিল যােগ-সাধনা। আগামীকাল থেকে কোনও যােগাসন ক্লাবে ভর্তি হয়ে যাও। আমি তােমাকে ভালাে পরামর্শই দিচ্ছি। প্রথমটা ক্লাসে ভর্তি হয়ে করাই ভালাে।

- দেখ কার্তিক। তুমি আমাকে কোনও প্রকারেই যােগের দিকে টানতে পারবেনা। শত চেষ্টা করেও না।
- শেখা, না-শেখা তােমার মর্জি। তবে যােগাভ্যাস করলে তােমার পরমায়ু বৃদ্ধি পেত। বাকি জীবনটা শান্তিতে কাটাতে পারতে। না শুনলে বিয়ােগব্যথায় কষ্ট পাবে।

-মাস্টার ধরে যােগাভ্যাস করা এ বয়সে সম্ভব নয়। তােমার যােগ ছাড়া অন্য কিচ্ছ যদি থাকে তাে বল। আচ্ছা, আজ আমি চলি। তােমার যােগ-বিয়ােগ নিয়ে তুমি থাকো। দু ' মাস পর আবার একদিন নবনীগােপালের সঙ্গে কার্তিক বােসের দেখা হয়ে এবার গড়িয়ার মােড়ে নয়। 

গােলপার্কের এক যােগাভ্যাসের আসর থেকে কে সে। আগের সেই চিমসানাে শরীর নেই। চোখে চশমা লাগিয়ে চোখটা মেদ করিয়েছে। হাঁটার ধরন-ই বদলে গেছে। কার্তিককে দেখে লজ্জায় পাশ কাটিয়ে চেষ্টা করছিল নবনী। কিন্তু কার্তিক-ই বা ছাড়বে কেন? সে বলল। 

 - নবনী, বিয়ােগ এড়াতে যােগের দিকে ঝুঁকে পড়লে? মেরামতিতে মন দিয়েছ মনে হচ্ছে ? চালিয়ে যাও ভায়া। লজ্জার কিছু নেই। শেখার কোনও বয়স নেই। কিছুটা পরমায়ু ঈশ্বরের কাছ থেকে আদায় করতে পারবে। আজ কয়েকটা রসগােল্লা হবে নাকি ? 


( বাক্ প্রতিমা সাহিত্য পত্রিকা থেকে সংগৃহীত )